কক্সবাজার, মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪

আরাকান আর্মির উত্থান: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে না বিপক্ষে?

মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) ১৪ বছর পার করে ফেলেছে। সশস্ত্র সংগঠনটি রাখাইনের মানুষের জন্য লড়ছে বলে দাবি করা হয়। সম্প্রতি এই সংগঠনটির ১৪ বছরপূর্তি উপলক্ষে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্যের সরকার (এনইউজি) একে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে শামিল অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলও এএকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরাও বলছেন, আরাকান আর্মি জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে ভালো করছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বাংলাদেশে থাকা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা সে বিষয়টি নিয়ে ভাবনার অবকাশ করেছে। বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যের সরকার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী বলে স্বীকৃতি দেয়ার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবনার দাবি রাখে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে কথা বলার আগে, বৈশ্বিক যেসব বিষয় বা প্রভাবক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রভাবিত করতে পারে সে বিষয় আলোকপাত করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সবচেয়ে বড় কয়েকটি প্রভাবক হলো চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ। এর বাইরে আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে আসিয়ানের প্রভাব রয়েছে।

মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব হলো চীনের। দেশটির জান্তা এবং জান্তাবিরোধী সরকার উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। দেশটিতে চীনের বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে। জান্তা সরকারের ওপর বিশ্বের অন্যান্য দেশ বা সংগঠনের চেয়ে চীনের প্রভাব বেশি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন বেশ কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম দুই দফা উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও তৃতীয় দফা উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চীন। কিন্তু তা কতটা আলোর মুখ দেখবে তাই এখন দেখার বিষয়।

তবে চীনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে বড় উল্লেখযোগ্য চাল চালা হয়েছে তা হলো, দেশটি বলেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ফোরামের বিষয় না করে সেটিকে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। এখানে চীনের অবস্থান স্পষ্ট। দেশটি চায় রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশ এবং মিয়ানামরের সরাসরি আলোচনায় সমাধান হোক। এবং এখানে অতি অবশ্যই চীনের ভূমিকা থাকবে। সোজা কথায় বললে, চীন চায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয় দেশেই নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হোক। পাশাপাশি চীন এখনই চায় না মিয়ানমারে রেজিম পরিবর্তন হোক। কিন্তু চীন এককভাবে চাইলেই বিষয়টি সে রকম হয়ে যাচ্ছে না। কারণ, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় খেলোয়াড়গুলোও মাঠে নেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘বার্মা অ্যাক্ট’ পাস করেছে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী সরকারকে সহায়তা দেয়া জন্য। সেখানে জাতীয় ঐক্যের সরকার, পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) এবং এথনিক আর্মড অরগানাইজেশনগুলোকে (ইএওএস) সরাসরি সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আরাকান আর্মি ইএওএসের অন্তর্ভুক্ত। ফলে মার্কিন সহায়তা আরাকান আর্মির কাছেও পৌঁছাবে। যার ফলে, জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মির মধ্যে রাখাইন অঞ্চলে লড়াই আরও তীব্র হতে পারে।

আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হলো, আরাকান আর্মিকে দমন করতে গিয়ে যদি জান্তা বাহিনী রাখাইনে শক্তি প্রয়োগ বাড়ায় তবে বাংলাদেশের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। যার অধিকাংশই দুর্গম-পাহাড়ি এলাকা। এসব অঞ্চলে জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির লড়াই বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। যদিও গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা সফরের সময় শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা মিয়ানমারে যে সহায়তা দেবে তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাখাইন অশান্ত হওয়া মানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই পথে হেঁটেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তারা মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১০০ ব্যক্তি এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সবমিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে চীন এবং একই সঙ্গে রাশিয়ামুখী করবে। যার উদাহরণ আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। রাশিয়ার কাছ থেকে মিয়ানমার বেশকিছু যুদ্ধবিমানসহ সমরাস্ত্র কিনছে, যা মিয়ানমারের সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। আবার পশ্চিমা বিশ্ব এরই মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার সঙ্গে এক ‘প্রক্সি যুদ্ধে’ জাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ এক বছর হয়ে গেলেও সেখানে কোনো ফলাফল আসেনি। পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, চলতি বছরেও এই যুদ্ধে কোনো ফলাফল আসবে না। এই অবস্থায় রাশিয়াকে চাপে রাখতে বিশ্বজুড়েই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব। সেটা হতে পারে মিয়ানমারেও। আর পশ্চিম যত বেশি জান্তার ওপর খড়গহস্ত হবে, মিয়ানমার-রাশিয়া তত ঘনিষ্ঠ হবে; যা বাংলাদেশের জন্য দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ‘করো সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’-শীর্ষক পররাষ্ট্রনীতি এখানে খানিকটা চাপে পড়ে যাবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গতিপ্রকৃতির কারণেই।

এর বাইরে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারত আসিয়ান। জোটটির সর্বশেষ সম্মেলনে মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সেখানে জান্তা এবং জাতীয় ঐক্যের সরকারের মধ্যে চলমান সহিংস ক্ষমতার লড়াইয়ের সমাধানের লক্ষ্যে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে শীর্ষ সম্মেলনের এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘রাখাইনের বাস্তুচ্যুত মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু জোটটি মিয়ানমারের ওপর এই বিষয়ে তেমন কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি।

এই অবস্থায় আরাকান আর্মির উত্থান বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই ধরনের ফলাফলই বয়ে আনতে পারে। ইতিবাচক দিক বিবেচনা করলে, মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকার যেহেতু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় তাই আরাকান আর্মি রাখাইনে জান্তা বাহিনীর ওপর জয়লাভ করলে এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার মিয়নামারের ক্ষমতায় আসলে হয়তো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ হবে। তবে আরাকান আর্মির বিজয় এবং জাতীয় ঐক্যের সরকারের ক্ষমতায় আসা অনেক যদি-কিন্তুর ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এত দ্রুত ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই।

নেতিবাচক দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনে জাতীয় ঐক্যের সরকার এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সশস্ত্র শাখা যদি জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায় তবে লড়াই দীর্ঘায়িত হতে বাধ্য। কারণ, জান্তা সরকারও নিশ্চয়ই ছেড়ে কথা বলবে না, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে আটকে দেবে।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আরাকান আর্মিকে বাংলাদেশ, চীন এবং ভারত কীভাবে বিবেচনা করছে। এশিয়া টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ, চীন এবং ভারতের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনোভাবে যদি আরাকান আর্মি রাখাইনে জান্তা বাহিনীর ওপর বিজয়ী হয় এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয় তবে বাংলাদেশকে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, তখন আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখাই থাকবে নীতিনির্ধারণী ভূমিকায়।

আরও একটি বিষয় আমলে নিতে হবে। জাতীয় ঐক্যের সরকার মূলত অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) এবং অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থি দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। এনএলডির সরকারের সঙ্গে আরাকান আর্মির তিক্ত অতীত রয়েছে। এনএলডি ক্ষমতায় থাকার সময় আরাকান আর্মির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দাবিগুলো স্রেফ নাকচ করে দিয়েছে। ফলে আরাকান আর্মি এত সহজেই অতীত ভুলে গিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকারকে ক্ষমা করে দিয়ে তাদের ওপর আস্থা রাখবে তা বিবেচনা করাও বোধহয় কঠিন।

এ অবস্থায় মিয়ানমারে আরাকান আর্মির উত্থান কিংবা এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে জটিল পরিস্থিতিরই সৃষ্টি করবে। কারণ, সশস্ত্র এ সংগঠনটির উত্থান কিংবা পতন দুই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে প্রভাবিত করবে। এখন বাংলাদেশ কীভাবে আসন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে তাই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: এশিয়া টাইমস, আল জাজিরা এবং হিমাল সাউথ এশিয়ান

পাঠকের মতামত: