কক্সবাজার, শনিবার, ২১ নভেম্বর ২০২০

ইয়াবার প্রবেশদ্বারেই স্থবির অভিযান, মাদককারবারিরা সুযোগ নিচ্ছে

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর থেকে ইয়াবার প্রবেশদ্বারখ্যাত কক্সবাজারে মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটাই থিতিয়ে পড়েছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে ইয়াবাকারবারিরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও মানছেন, রাজধানীতে ইয়াবা সরবরাহ সম্প্রতি বেড়ে গেছে, বেড়েছে এ মরণনেশার বিক্রিও।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ এক প্রকার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে; থেমে যায় ইমেজ সংকটে থাকা বাহিনীটির ইয়াবাবিরোধী অভিযান। কক্সবাজার পুলিশে মাদকবিরোধী অভিযান এতটা স্থবির এর আগে কখনো দেখা যায়নি, বলছেন স্থানীয়রা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেনকে অন্যত্র বদলি করে ঝিনাইদহের এসপি হাসানুজ্জামানকে কক্সবাজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২১ সেপ্টেম্বর বদলি করা হয় কক্সবাজার জেলা পুলিশের শীর্ষ সাত কর্মকর্তাকে। শুধু তাই নয়, এর পর পুলিশে শুদ্ধি অভিযান চলে পুরো জেলাজুড়ে; করা হয় ব্যাপক রদবদল। জেলার সব পুলিশ সদস্যকে অন্যত্র বদলি করা হয়; যুক্ত করা হয় নতুন পুলিশ সদস্যদের।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের নতুন সদস্যরা ইয়াবাবিরোধী হাতেগোনা দুই-একটি অভিযান চালিয়েছে। পুলিশসূত্রের খবর, পরিস্থিতি বুঝেশুনে ধীরে ধীরে মাদকবিরোধী অভিযানের বিস্তৃতি ঘটানো হবে। যদিও ইয়াবাবিরোধী অভিযান বেগবান করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এ জেলার পুলিশকে। এসব নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম হলো- কোন এলাকায় কারা ইয়াবা কারবারে যুক্ত, তাদের বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান পরিচালনা এবং তালিকা হালনাগাদ করা। এ ছাড়া ইয়াবা কারবারের রাঘববোয়ালদের চিহ্নিত করা।

মাদকবিরোধী অভিযানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সিনহা হত্যাকা-ের পর অভিযান শিথিলের সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ইয়াবাকারবারিরা। প্রচলিত ইয়াবা পাচারের রুটের পাশাপাশি নতুন কিছু রুটেও ঢুকছে ইয়াবা। বড় চালান থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়েও ইয়াবার সরবরাহ বেড়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিকল্প রুট হিসেবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা। আর বিকল্প রুটের ইয়াবার বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। ঘুমধুম সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি থাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লুকিয়ে রেখে পরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের ৮ মে থেকে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের কারণে নিয়ন্ত্রণ না হলেও অনেকটাই কমে এসেছিল ইয়াবার সরবরাহ। বিশেষ করে জোগান না থাকায় রাজধানীতে ইয়াবা বিক্রিতে ভাটা পড়ে, যা এখন ফের বেড়ে গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর থেকে প্রায় বন্ধ রয়েছে কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনা। এ ঘটনার আগে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে ক্রসফায়ার ছিল রোজকার বিষয়; নিহতদের অধিকাংশই ছিল ইয়াবাকারবারি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনোয়ার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, আবার আমরা অভিযান শুরু করেছি। ধীরে ধীরে অভিযান জোরদার করা হবে।

অবশ্য সিনহা হত্যাকাণ্ডের পরও কিছু অভিযান পরিচালনা করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ ইয়াবার একটি বড় চালানও রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনামূলক বিচারে সাম্প্রতিককালে ইয়াবাবিরোধী অভিযান অনেকটাই কম পরিচালিত হয়েছে- এমনটি মনে করে না র‌্যাব। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, র‌্যাবের যে ম্যান্ডেট রয়েছে, সেটি অনুসরণ করেই নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই সময়েও সেটিই করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর কক্সবাজার জেলা পুলিশ এক ধরনের ইমেজ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের কর্মকাণ্ডের কতটা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আর কতটা ব্যক্তিস্বার্থে ছিল সেই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে একটি ঘটনা ঘটলে ওই এলাকায় পুলিশের সব অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি না। বর্তমান জেলা পুলিশের টিম অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ করে ইয়াবার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে ভালো ভালো সব কাজ করতে পারে। ইয়াবাবিরোধী অভিযানে সব সময় প্রকৃত অপরাধীদের দমন করতে হবে। পুলিশের ভালো কাজই কক্সবাজার জেলা পুলিশকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ জনকে আসামি করে সিনহার বোন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন। পর দিন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন ওসি প্রদীপসহ সাত আসামি। মামলাটির তদন্ত করছে র‌্যাব।

পাঠকের মতামত: