কক্সবাজার, শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০

শুটকি তৈরি ও শুকানোর ধুম

উখিয়া-টেকনাফ উপকূল জুড়ে চলছে শুটকী উৎপাদন

উখিয়া বার্তা ডেস্ক::

‘ছুরি হুঁনির তরকারি, বেশি অইয়ে ঝাল/কি ছালন রাইন্ধে বউয়ে/পুরি যারগই গাল’- শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের গাওয়া এ গানেই লুকিয়ে আছে কক্সবাজার তথা চট্টগ্রামে উৎপাদিত শুঁটকির আদ্যোপান্ত। এখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে এই সু-স্বাদু শুঁটকি।

প্রতি বছর শীত এলে এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় স্থান করে নেয় নানা ধরনের শুঁটকির তরকারি। রান্নায় তরকারির প্রধান পদ হিসেবেও এটিকে রাখেন ভোজনপ্রিয় অনেকে।
তবে সেই তরকারিতে যদি বাহর পাতা মেশানো হয় তাহলে তো আর কথায় নাই। শীত আসার
আগে এই সময়ে শুঁটকি তৈরি ও শুকানোর ধুম পড়েছে উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে। অনেকেই
বলে উপকূলবর্তী এলাকার বাতাসে পাওয়া যায় শুঁটকির ঘ্রাণ। শুটকি বিক্রির মাধ্যমে স্বাবলম্বী
হচ্ছে হাজারেরও অধিক পরিবার। স্বচ্ছল জীবন যাপন করছে অসংখ্য মানুষ। শুটকি ব্যবসায়ীদের
অভিমত মৌসুমে উপকূলীয় এলাকায় কোটি টাকার শুটকি লেনদেন হয়ে থাকে। দূরদুরান্ত থেকে
শুটকি ব্যবসায়ীরা শুটকি কিনতে ভিড় জমান উখিয়া টেকনাফের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে।
বঙ্গোপসাগরের পাশেই এ সরকারের নির্মিত নান্দনিক মেরিন ড্রাইভের পশ্চিমে কৃষি জমিতে ছোট ছোট কাঁচা ঘর করে বসবাস করছে বেশ কিছু পরিবার। তারা বাশেঁর চাঙ্গা ও লম্বালম্বি বাঁেশর ফ্রেম করে শুটকি শুকাতে দেখা গেছে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মুলত এরা সাগর উকূলে শুটকী উৎপাদন ও বাজারজাত করন করে জীবন যাপন করে থাকে।

যে কারনে অনেকেই এটাকে শুটকী পল্লী হিসাবে চিহ্নিত করেছে। পানি ভর্তি ড্রামের মধ্যে লবন
মিশিয়ে তারা এগুলো গুলিয়ে নেয়। তারপর উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন ফিশিংবোট থেকে
সংগৃহীত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঐ লবন পানিতে বেশ কয়েকবার চুবিয়ে চাটাইতে শুকানোর জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখে। এদের মধ্যে কথা হয় আছিয়া খাতুন (৫৫) নামের এক মহিলার সাথে। সে জানায় তার স্বামী মহিবুল্লার ফিশিং বোটের মাঝি হিসাবে দীর্ঘ দিন যাবৎ সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। সে সমুদ্র থেকে তীরে নোঙর
করার পর উন্নত জাতের মাছগুলো ফিশিং বোটের মালিক পক্ষ বিক্রি করে তাদের প্রাপ্য মজুরী দিয়ে
দেন। ঐ মজুরীর টাকা দিয়ে সে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে আসলে রোদে
শুকিয়ে শুটকী তৈরি করেন। সে জানায়, এখন চলছে শুটকী শুকানোর মৌসুম। আর কয়দিন পর
ব্যবসায়ীরা এখানে এসে পাইকারী দরে এসব শুটকী কিনে নিয়ে যাবে।
পাশেই আরেকটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাশঁ দিয়ে লম্বা করে মাচাং বানানো হয়েছে। সে মাচাংয়ে খুব সুন্দর পরিপাটি করে। শুকানো হচ্ছে ছুরি মাছ। জানতে চাইলে ৪০/৪৫ বছর বয়সী ইমাম হোছন জানায় সে আগে সাগরে মাছ ধরত। একদিন নৌকা ডুবিতে তার নৌকার ৫জন মাঝি মল্লা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় না।
সে থেকে মাছ শুকিয়ে তা বিক্রি করে জীবন ধারন করে থাকেন। কাচাঁ চুরি শুটকি কত করে
কেনা হয়েছে জানতে চাইলে ইমাম হোসেন জানান, এক কেজি ছুড়ি শুটকী ছোট ১২০, বড়
১৫০ টাকা করে কেনা হয়েছে। সে বলে এক কেজি কাচাঁ শুটকি শুকালে পাচঁশ গ্রাম হবে।
পাইকারীভাবে পাচঁশ গ্রাম শুটকীর দাম পড়বে ৪শ টাকা।
আর একটু হেটেঁ সামনে গিয়ে দেখা যায় মাটিতেও শুটকী শুকানো হচ্ছে। জুলেখা বেগম নামের এক মহিলা জানায়, এগুলো তারা যেখানে সামুদ্রিক মাছ লেনদেন হয়, সেখান থেকে কুড়িয়ে এনে শুকাতে দিয়েছে। রোদে শুকিয়ে শুটকীতে পরিনত করবেন। এগুলো কেজিতে ১৫০টাকা করে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকাররা নিয়ে যায়। এলাকার একজন মৎস ব্যাপারী হিসেবে পরিচিত সাগর মাঝি (৫৫) জানায়, প্রতি মৌসুমে উপকূলে এ শুটকী পল্লী
থেকে প্রায় কোটি টাকার শুটকী লেনদেন হয়। বিশেষ করে কক্সবাজার অঞ্চল ভিত্তিক খুচরা
বিক্রেতারা এসব শুটকী সংগ্রহের জন্য এখানে ভিড় করে থাকেন। সে জানায়, শুটকী উৎপাদনের
মধ্যে উপকূলের হাজারের অধিক পরিবার তাদের জীবন জীবিকা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এলাকার লোকজন বলেন, শুঁটকি দিয়ে ভর্তা, বেগুন দিয়ে শুঁটকি রান্না, ডাল দিয়ে শুঁটকির কারি, শুঁটকির মাথা দিয়ে বিশেষভাবে ভর্তা এবং শুঁটকি দিয়ে সালাদ তৈরিতে প্রসিদ্ধ উখিয়া টেকনাফ তথা কক্সবাজার অঞ্চল। শীতের আগের এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় কম সময়ে শুঁটকি শুকায়। তাই সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার তীরে বৃহৎ পরিসরে শুঁটকি উৎপাদন ও শুকানোর কাজ শুরু হয়। উপকূলবর্তী স্পটগুলোতে প্রতিদিন সূর্যের তাপে ছোট-বড় ৩০ থেকে ৩৫ প্রজাতির মাছ শুকানো হয়। এসব উপকূল থেকে প্রতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার শুঁটকির লেনদেন হয়। উপকূলে সারি সারি চাঙ সাজিয়ে শুকানো হচ্ছে ছুরি, ফাঁইস্যা, ইচা, লইট্টা, লাক্ষ্যা, কোরাল, রূপচাঁদা, পোয়া ও ছোট-বড় মিশালি জাতের শুঁটকি।
এক একটি চাঙে কাজ করে ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক। তাদের মধ্যে প্রায় বেশির ভাগই নারী।
এখান থেকে উপার্জিত আয় দিয়েই চলে কয়েকশ পরিবার।
উপকূলীয় মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি নাজির হোছন মাঝি জানান, উপকূলীয়
এলাকায় বসবাসরত পরিবারের মধ্যে বেশির ভাগ দিনে এনে দিনে খায়। তারা ছেলে মেয়ে নিয়ে
সমুদ্র তীরবতর্ী এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংগ্রহ পূর্বক তা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করে জীবন ধারণ করে। তাছাড়া এখানকার উৎপাদিত শুটকি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানী হয়ে থাকে। তিনি বলেন, সরকারীভাবে শুটকী প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্যোগ নেয়া হলে এখানকার শুটকী বিদেশে রপ্তানীর মাধ্যমে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব ছিল। যেহেতু টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১শ কিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকায় বেশিরভাগ অংশে শুটকী উৎপাদন হচ্ছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুরজিৎ পারিয়াল বলেন, দেশের বৃহত্তম চরাঞ্চল খ্যাত উখিয়া টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় কাঁচা মাছ প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে তৈরি করা শুটকির কদর সারাদেশে রয়েছে। তাই এসব শুটকি উৎপাদনে জেলেদের উৎসাহিত করা হবে। শুটকি উৎপাদন করে যেন স্বাবলম্বী হতে সে ব্যাপারে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।

পাঠকের মতামত: