কক্সবাজার, রোববার, ২১ এপ্রিল ২০২৪

কক্সবাজারে আশেক পেলেন ‘সবুজ সংকেত’, বাকি তিন এমপি শঙ্কায় !

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাস দেড়েক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কক্সবাজার সফরের পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস পাওয়া গেছে। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, দিনব্যাপী ওই সফরে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দলীয় প্রধান যেসব ইঙ্গিত দিয়েছেন তাতে ধারণা করা হচ্ছে, কক্সবাজারের চারটি আসনের মধ্যে অন্তত তিনটিতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে।

তবে কক্সবাজার-২ আসনের (মহেশখালী ও কুতুবদিয়া) বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) আশেক উল্লাহ রফিক আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন বলেই ধরে নিয়েছেন নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি জেলা সফরে গিয়ে আগামী নির্বাচনে নৌকায় ভোট চাইলেও কোনো এমপি বা প্রার্থীকে মঞ্চে ডেকে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেননি আওয়ামী লীগ সভাপতি।

কক্সবাজারে এসে মাতারবাড়ীর জনসভায় শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার সময় এমপি আশেককে মঞ্চে নিজের কাছে ডেকে নেন এবং সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আশেককে আপনাদের হাতে তুলে দিলাম।’ এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি মনোনয়নের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিয়েছেন বলে বিশ্বাস এমপি আশেক ও তার অনুসারীদের। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারাও বিষয়টিকে দলীয় সভাপতির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ধরে নিয়ে বলছেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়া প্রথম প্রার্থী হলেন কক্সবাজারের আশেক।

বহুল প্রতীক্ষিত দোহাজারি-কক্সবাজার রেলপথ উদ্বোধন উপলক্ষে সাড়ে পাঁচ বছর গত ১১ নভেম্বর কক্সবাজার সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কক্সবাজারের চারটি আসনের বর্তমান এমপি ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে আশেক ছাড়া অন্য কেউ দলীয় সভাপতির কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রেললাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পৌঁছার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কদমবুচি করেন কক্সবাজার-৩ আসনের (সদর, ঈদগাঁহ ও রামু) এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল। তবে প্রধানমন্ত্রী তার দিকে কোনো মনোযোগ দেননি। এমনকি রেললাইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলার চার এমপির মধ্যে একমাত্র কমল মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও তিনি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি। ওই অনুষ্ঠানে কক্সবাজার-১ আসনের (চকরিয়া-পেকুয়া) এমপি জাফর আলম ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এমপি শাহিনা আক্তার চৌধুরী স্থান পেয়েছেন সুধী-দর্শক সারিতে। এমপি আশেক মাতারবাড়ীর জনসভায় ব্যস্ত থাকায় রেললাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। সরকারি অনুষ্ঠান শেষে বিকালে আওয়ামী লীগের জনসভায় অংশ নিতে ২৮ বছর পর মাতারবাড়ীতে যান শেখ হাসিনা। জনসভার মঞ্চে জাফর, আশেক ও কমল উপস্থিত থাকলেও শাহিনা আক্তার ওই সমাবেশেই যাননি। বক্তৃতা করার সময় প্রধানমন্ত্রী যখন আশেককে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন পেছনে থেকে এমপি জাফর শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে বলেন, ‘আমিও আছি।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জাফর আলমের দিকে নজর ফেরাননি।

ওই মঞ্চে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বশীল একজন নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আগামী নির্বাচনে কে দলীয় মনোনয়ন পাবেন কে পাবেন না তা নির্ধারণ করবেন দলের সভাপতি। কক্সবাজার সফরে এসে আকারে-ইঙ্গিতে তিনি এ ব্যাপারে কিছুটা আভাসও দিয়েছেন। এমপি আশেককে যেভাবে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন, তাতে বোঝা যায় তাকে দলীয় মনোনয়নের চূড়ান্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

কেন্দ্রীয় আরেক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর বিশ্লেষণ করে বলা যায়, কক্সবাজার-২ আসন ছাড়া অন্য তিনটিতে প্রার্থী পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত তালিকাও তৈরি হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কারা পাচ্ছেন তাদের প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত হবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ঘোষণা দিয়েছেন এটাই চূড়ান্ত মনোনয়ন। মাতারবাড়ী দুর্গম একটি এলাকা। সেখানে যে জনসভা আয়োজন করা হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত সফল হয়েছে। এটি আশেকের এলাকা। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবার সব খবর ও তথ্য রয়েছে। আশেক সম্পর্কে নিশ্চয়ই তার ভালো ধারণা রয়েছে।

বাকি তিন আসনের ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ওইসব আসনের খবরও দলীয় প্রধানের কাছে রয়েছে। তিনি ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি যাকে নৌকা দেন নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবেন।

এমপি আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, মাঠে কাজ শুরু করেছি অনেক আগেই। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার পর এখন আরও জোর পাচ্ছি।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের সঙ্গে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, জনসভার আয়োজক ছিল মহেশখালী উপজেলা। হয়তো সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী কেবল মহেশখালী- কুতুবদিয়া আসনের প্রার্থীকে জনগণের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। অন্যদের বিষয়ে সময়মতো ঘোষণা দেবেন।

যে কারণে কপাল পুড়তে পারে তিন এমপির

আশেক উল্লাহর মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বাকি তিন এমপির ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। দলীয় সভাপতি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করায় আগামী নির্বাচনে তারা মনোনয়ন পাচ্ছেন না বলেই ধারণা স্থানীয় নেতাকর্মীদের। তারা বলছেন, এই তিন এমপি বিভিন্নভাবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নেতিবাচক সংবাদে উঠে এসেছেন বারবার। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ কোন্দল উস্কে দেওয়া ও দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও এই তিন এমপির ব্যাপারে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে বলেও শোনা যায়। হয়তো এসব কারণ বিচার-বিশ্লেষণের পর আগামীবার তাদের নৌকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের হাইকমান্ড।

এই তিন এমপির মধ্যে জাফর আলমের বিরুদ্ধে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখল, দলে গ্রুপিং সৃষ্টি, নেতাকর্মীদের মারধর, সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সপরিবারে তাকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছে।

সাইমুম সারওয়ার কমলের বিরুদ্ধেও রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, সরকারি জমি দখল, জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং সরকারের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে অন্য দলের লোকজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ শোনা যায় তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়েও সমালোচিত হয়েছেন তিনি।

মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সমালোচনার শেষ নেই বদিকে নিয়ে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এমপি হন। যদিও তার বাবা এজাহার মিয়া কোম্পানী ছিলেন টেকনাফ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় পার্টির সমর্থনে তিনি টেকনাফের প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর নৌকার প্রার্থী হতে সমস্যা হয়নি বদির। তবে এমপি থাকাকালেই দুদকের একটি মামলায় তিন বছরের কারাদণ্ড হয় তার। এজন্য গত নির্বাচনে বদির পরিবর্তে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তার স্ত্রী শাহীন আক্তার। কিন্তু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে স্থানীয় জনগণ এবং দলীয় নেতাকর্মীরাও শাহীনের দেখা পাননি।

কক্সবাজারের চারটি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী যারা

কক্সবাজার ১ : বর্তমান এমপি জাফর আলম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক শিক্ষা ও মানব সম্পাদক বিষয়ক সম্পাদক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম সজীব, সাবেক নেতা রাশেদুল ইসলাম ও অবসরপ্রাপ্ত জজ আমিনুল হক।

কক্সবাজার ২ : এমপি আশেক উল্লাহ ছাড়াও এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে ছিলেন পরিবেশবিজ্ঞানী ড. আনছারুল করিম ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল মোস্তফা।

কক্সবাজার ৩ : এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজিবুল ইসলাম।

কক্সবাজার ৪ : বর্তমান এমপি শাহিনা আক্তার এই আসনের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির স্ত্রী। বিতর্কিত নানা ঘটনায় নাম আসার পর গত নির্বাচনে বদি ভোটে দাঁড়াননি। তার পরিবর্তে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন শাহিনা। আগামী নির্বাচনে এই আসন থেকে বদি আবার নৌকা নিয়ে প্রার্থী হতে চান। এ ছাড়াও তোড়জোড় চালাচ্ছেন টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল বশর, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সোহেল আহমদ বাহাদুর, উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী।

পাঠকের মতামত: