কক্সবাজার, শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১

কর্ণফুলী-হালদার ‘নীরব কান্না’

মাত্রাতিরিক্ত দূষণ, দখল, ভরাটের শিকার দেশের লাইফলাইন খ্যাত কর্ণফুলী ও প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী। নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট না থাকায় কঠিন ও তরল বর্জ্য সরাসরি এ দুইটি নদীতে মিশে যাওয়ার কারণে এ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।
ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজের ওপর চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রণীত মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে। এসব বর্জ্য সরাসরি নালা ও খাল হয়ে হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। অথচ এ দুটি নদী ওয়াসার সুপেয় পানির প্রধান উৎস। এছাড়া নগরীতে দৈনিক প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য হয়। এসব বর্জ্যরে একটি অংশও নদীতে গিয়ে পড়ছে। নগরীর তরল ও কঠিন বর্জ্য ছাড়াও নদীর দুই ধারের শিল্পকারখানার দূষিত কেমিক্যালও হালদা ও কর্ণফুলী গিয়ে পড়ে। এ কারণে ক্রমাগত দূষণের শিকার হচ্ছে এ দুইটি নদী।
ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য নিঃসৃত হচ্ছে যা ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন ৫১ কোটি লিটারে উন্নীত হবে। ফলে এসব পয়ঃবর্জ্য, শিল্প বর্জ্য ও হাসপাতাল বর্জ্য মূলত খাল ও নালা হয়ে হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে পড়ছে। নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা না হলে নগরীর একমাত্র সুপেয় পানির উৎস এ দুটো নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার হবে। এতে চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণসহ নগরীর সুপেয় পানি সরবরাহে সংকট সৃষ্টি হবে। তবে এ সংকট নিরসনে ওয়াসা একটি স্যুয়ারেজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির তিনটি প্যাকেজে দরপত্র মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’
নদী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভাবনা তৈরি করতে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব নদী দিবস’। বিশ্বের মত বাংলাদেশও দিবসটি পালন করে আসছে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরীতে বর্তমানে দৈনিক ৪৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এর মধ্যে গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ করা হয় মাত্র চার কোটি লিটার। অবশিষ্ট ৪২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ হয় ভূ-উপরিস্থ প্রকল্পের মাধ্যমে। এরমধ্যে মোহরা শোধনাগার প্রকল্প থেকে ৯ কোটি লিটার, মদুনাঘাটস্থ শেখ রাসেল পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে ৯ কোটি লিটার এবং শেখ হাসিনা পানি সরবরাহ প্রকল্প-১ ও ২ থেকে ২২ কোটি লিটার। ভূ-উপরিস্থ প্রথম দুইটি প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর পাড়ে। অপরদিকে শেখ হাসিনা পানি সরবরাহ-১ ও ২ প্রকল্প দুইটি স্থাপন করা হয়েছে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে রাঙ্গুনিয়া পোমরা এলাকায়। এ দুইটি প্রকল্প ছাড়াও কর্ণফুলী নদীতে আরো একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালী উপজেলায় ভাণ্ডালজুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ওয়াসা। এটির উৎপাদন শেষ হলে কর্ণফুলী নদী থেকে দৈনিক আরো ৬ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হবে। এছাড়া ওয়াসার মোহরা পানি শোধনাগার দ্বিগুণ করা হলে হালদা থেকে উত্তোলন করা হবে আরো দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হালদা ও কর্ণফুলী নদী থেকে কমপক্ষে দৈনিক ৬০ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হবে। কিন্তু দূষণ অব্যাহত থাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহে হুমকিতে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রাঙামাটির চন্দ্রঘোনা থেকে পতেঙ্গাস্থ কর্ণফুলীর মুখ পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোটিমার স্থান জুড়ে অন্তত ৩০০টি কারখানা কিংবা শিল্প স্থাপনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে পেপার মিল, তেল শোধনাগার, পাওয়ার প্ল্যান্ট, ট্যানারি, সার প্রস্তুতকারক, সাবান এবং সিমেন্ট তৈরির কারখানাও রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়। অপরদিকে শতাধিক কারখানায় তরল বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকলেও উৎপাদন খরচ কমাতে মালিকরা সেগুলো ব্যবহার করছে না। ফলে কর্ণফুলী নদীতে দূষণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে।
এছাড়া কর্ণফুলীর দুই পাড়ে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা শুরু করলেও এক সপ্তাহ পরেই সেটি বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। পুনরুদ্ধার করা জমি পরিচালনায় সমস্যার অজুহাতে তারা অভিযান বন্ধ করে দেয়। কিন্তু নানা কারণ ও সীমাবদ্ধতায় দুই তীরে অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়নি এখনো।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়কারী প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘শহরের ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে ভয়াবহ দূষণ হচ্ছে হালদা ও কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলী নদীর দু’পাশে কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। বিশেষ করে অক্সিজেন ও কূলগাঁও এলাকার শিল্পকারখানা ও আবাসিক বর্জ্য সরাসরি হালদা নদীতে পড়ছে।’

পাঠকের মতামত: