কক্সবাজার, বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০

কৃষক বাবার অনুপ্রেরণায় ছেলে বিসিএস ক্যাডার

রাজিবুল ইসলাম::

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় কৃষক বাবা বলেছিলেন জীবনে তোমাকে ভালো কিছু হতে হবে। পারলে তোমার এলাকায় যেই দুজন বিসিএস ক্যাডার আছে তেমন কিছু হও। সেই থেকে শুরু।

তারপর প্রায় ২০ বছরের লম্বা যাত্রা। এরপর হয়ে গেলেন ৩৮ তম বিসিএস ক্যাডার। বলছিলাম মাদারীপুর জেলার কালাকিনি উপজেলার বাশঁগাড়ী ইউনিয়নের পরিপত্তর গ্রামের মজিদ তালুকদারের ছেলে আজাহারুল ইসলামের কথা।

শৈশবে বাবার দেখানো সেই ইচ্ছে পূরণ করেছেন আজাহারুল। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে পেরে ভীষণ খুশি পরিবারের ছোট ছেলেটি।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে আজাহারুল পঞ্চম। বাবা কৃষি কাজ করেই সংসারের যোগান দেন। জীবনে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়েই পার হয়েছে আহারুলের জীবন।

লেখাপড়ার ফাকেঁ ফাকেঁ বাবাকেও কৃষি কাজে সাহায্য করেতেন। তবে মনে আত্মবিশ্বাস ছিলো প্রবল। অদম্য চেষ্টায় এগিয়ে গেছেন নিজের গন্তব্যে। তারপর উর্তীন্ন হয়েছেন বাবার অনুপ্রেরণায় সেই কাঙ্খিত দারপ্রান্তে। হয়ে গেলেন ৩৮ তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার (ইংরেজী)।

তিনি বলেন, ‘পরিবারই সফলতার মূল চাবিকাঠি। আমার মা-বাবা কারণেই আমি ক্যাডার হতে পেরেছি। প্রতিটা পদক্ষেপেই আমাকে ঢালের মত আগলে রেখেছেন। আমার ভাই হেদায়েতুল ইসলাম সব সময় আমার যখন যা লাগত তা দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। আমার বোনেরা সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।

সর্বোপরি, ক্যাডার হতে হলে পরিবার ভূমিকাই মুখ্য হিসেবে কাজ করে। ভবিষ্যৎতে দেশের মানুষের একজন আদর্শ সেবক হতে চান তিনি। দেশের মানুষের ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চান সদ্য ক্যাডার হওয়া এই যুবক।

বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পেছনের গল্প দৈনিক আমার সংবাদকে শুনান এই ক্যাডার-আজাহারুল বলেন, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পেছনে আসলে আমার কোন জেদ নেই, ছিল অঢেল অনুপ্রেরণা, আমার বাবা-মা ই ছিল আমার অনুপ্রেরণার সাগর। তাঁদের অনুপ্রেরণা না থাকলে আমার এ যাত্রা সফল হত না। এলাকার বড় ভাই হাসান জাহিদ ও খুব কাছে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।

আসলে এটা ছিল আমার প্রথম বিসিএস তাও ছিল “অ্যাপেয়ার্ড সার্টিফিকেট” দিয়ে। আমি যখন বিসিএসে আবেদন করি তখনো আমার অনার্স শেষ হয়নি। এমতাবস্থায় আমার ডিপার্টমেন্টের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলীরা আমাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন এবং সাহস যুগিয়েছেন।

এরপর আমার বন্ধু-বান্ধবীরা খুব কাছ থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি খুব সিরিয়াসলি পড়তাম বিসিএসের জন্য, যখন আমি প্রিলি পাস করলাম তখন থেকেই আমার কিছু কিছু বন্ধু আমাকে “বিসিএস বন্ধু”, “মি. বিসিএস” “বিসিএস ভাই” ইত্যাদি বলে দুষ্টামি করত।

ওদের দুষ্টামিগুলো আমি একটু সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম আর মনে মনে সংকল্প নিয়ে পড়তে থাকলাম। অনেক সময় অনেক উপহাসেরও শিকার হয়েছি কিন্তু সেটাও আমার জন্য আশীর্বাদই ছিল। আর সে কারণেই আল্লাহ্‌র রহমতে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি।

ডিপার্টমেন্টের পড়াশুনার পাশাপাশি সময় বের করে নিয়ে পড়তাম। আর আগে থেকে পড়তাম বলেই সাধারণ জ্ঞানের বিষয়টা রপ্ত করতে পেরেছিলাম।

আর অন্যান্য বিষয়ে মৌলিক বিষয়গুলি আমার আয়ত্তে ছিল। তাই ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর যখন প্রিলি পরীক্ষা দেই তা খুব সহজেই উৎরে যাই এবং প্রিলি পাশ করে যাই।

প্রিলির জন্য ভালো করে প্রিপারেশন নিতে গেলে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। আমারও তাই লেগেছিল। এরপর রিটেনের জন্য ৪/৫/৬ মাস সময় পাওয়া যাবে যেটাকে মনপ্রাণ দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। আমিও সেটাই করেছি।

এরপর রিটেনের রেজাল্ট হতে ৫/৬/৭ মাস লাগে সাধারনত। ঐ সময়টা আমি ভাইভার জন্য পড়েছি। ভাইভা শেষ হওয়ার দু-এক মাস পরেই ফাইনাল রেজাল্ট পাওয়া যায়।

মূল কথা, প্রিলির পূর্বেই আমার প্রস্তুতি ছিল দুই বছরের। আর পরের সময়টা খুব সতর্কতার সাথে সদ্ব্যবহার করেছি। আর তাই আমি এ যাত্রায় সফল।

আমি সাধারণত ৬-৭+ ঘন্টা করে পড়তাম তবে খুব মনোযোগ ও টেকনিক সহকারে পড়তাম। শুধু পেইজের পর পেইজ পরলেই হবে না সেটাকে তো মাথায় রাখতে হবে। আর নিয়মিত পড়তাম।

বিসিএস এমন একটা এক্সাম এখানে টিকতে হলে, হতে হবে কঠোর পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল ও টেকনিক্যাল। ধরুন একটা প্রশ্ন আসলো পরীক্ষায়, সবাই ই উত্তর করলো কিন্তু যে উত্তরটাকে ডাটা-কোটেশন দিয়ে তথ্যবহুল করে লিখলো সেই কিন্তু বেশি মার্কস পাবে।

আবার ধরেন, প্রিলিতে টিকতে হলে আপনাকে অবশ্যই টেকনিক্যাল হতে হবে, যেসব প্রশ্ন পরীক্ষায় আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই, আপনি দিন-রাত কষ্ট করে সেসব প্রশ্ন পড়লেন কিন্তু পরীক্ষায় আসলো না, তাতে কি লাভ হলো!

অবশ্যই সিলেবাস ও পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, তবেই আপনি সফল হবেন। আপনার বিচিত্রমুখী দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ৪-৫ লাখ পরীক্ষার্থীদের পিছনে ফেলে ক্যাডার হতে হবে। আপনাকে অবশ্যই কৌশলী হতে হবে ও দক্ষ হতে হবে।

আজাহারুল ইসলাম ২০০৮ সালে খাসেরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ২০১০ সালে সরকারী নাজিমুদ্দিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে।

পাঠকের মতামত: