কক্সবাজার, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০

‘ক্রসফায়ার-ব্ল্যাকমেইল’: ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলার মিছিল

টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলা হচ্ছে। মেজর (অব.) সিনহা হত্যার পর এপর্যন্ত আরো নয়টি মামলার খবর পাওয়া গেছে। মামলাগুলোর অভিযোগ একই রকম ‘টাকা না পেয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা’। তবে সিনহা হত্যা মামলার বাইরে অন্য মামলাগুলোর তদন্ত নিয়ে তেমন তোড়জোড় দেখা যাচ্ছেনা। মামলাগুলো হয়েছে আদালতে। আদালত আবার সংশ্লিষ্ট থানাকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। তাই আশঙ্কা, সিনহা হত্যার বাইরে মামলাগুলোর তদন্ত কি আদৌ সঠিক ও দ্রুতগতিতে হবে?

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘মামলা মামলার গতিতে চলবে।’

৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভের চেকপোস্টে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যা করা হয় ক্রসফায়ারের নামে। বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য টেকনাফ থানার পক্ষ থেকে একটি ‘সাজানো’ এজাহার করা হয়। পরে সিনহার পরিবারের পক্ষ থেকে নয়জনকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা হয়। সেই মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। এই মামলায় টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস, এসআই লিয়াকত, নন্দ দুলাল রক্ষিত গ্রেপ্তার হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। টেকনাফের অনেকেই ওসি প্রদীপের ‘ক্রসফয়ার বাণিজ্য’ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কেউ কেউ মামলাও করেন। আর এই মামলা অব্যাহত আছে।

মামলার পর মামলা

প্রদীপের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয়েছে টাকা না পেয়ে আমানুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক ও তার ছোট ভাই আজাদুল ইসলাম আজাদকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে। তাদের ছোট বোন রিনাত সুলতানা শাহিন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের আদালতে ২ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেছেন।

তিনি অভিযোগ করেছেন, ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই রাতে চন্দনাইশ এলাকা থেকে আজাদকে গ্রেপ্তার করে টেকনাফ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় তার বড় ভাই ফারুককে। এরপর আট লাখ টাকা দাবি করা হয় ছেড়ে দেয়ার জন্য। টাকা দিতে না পারায় ১৬ জুলাই সকালে ওসি প্রদীপ ফোন করে তাদের লাশ নিয়ে যেতে বলে। এদের মধ্যে ফারুক একটি মাদক মামলার আসামি ছিলেন এবং মোবাইল ফোন মেরামতের ব্যবসা করতেন। আর তার ছোট ভাই আজাদ বাহরাইন প্রবাসী ছিলেন। ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন।

এর আগে ওইদিনই কক্সবাজার আদালতে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আরো দুইটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নে মুছা আকবর ও সাহাব উদ্দিন নামে দুই যুবককে ধরে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে মামলা দুটি করা হয়। মুছা আকবর হত্যা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, টেকনাফ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে ঘর পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করায় গত ২৮ মার্চ রাতে পুলিশ মুছাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর ২০ লাখ টাকা দাবি করা হলে তার পরিবার তিন লাখ টাকা দেয়। তারপরও ভোরে মুছাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে নিহত সাহাব উদ্দীনকে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল টেকনাফ থানা পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। ক্রসফায়ার থেকে বাঁচতে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় । তার পরিবার ৫০ হাজার টাকা দিতে পারে। পুরো টাকা না পেয়ে ২০ এপ্রিল রাতে সাহাব উদ্দীনকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রদীপ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও রয়েছে একটি। দুদক চট্টগ্রামে ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে এই মামলা করে ২৩ আগস্ট। এই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে তিন কোটি ৯৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে।

কেন এখন মামলা?

সিনহা হত্যার আগে ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে এরকম মামলার পর মামলা হয়নি। মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সিনহা হত্যার তদন্ত এবং ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীরা গ্রেপ্তার হওয়ায় মানুষ মনে করছে সরকার তার অপকর্মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তাই যারা প্রদীপের অপকর্মের শিকার হয়েছেন তারা সাহস পাচ্ছেন, মামলা করছেন।’ এখন এই মামলাগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা আরো দৃঢ় হবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রদীপ ও তার সহযোগীরা ‘ক্রসফায়ারকে’ একটি বাণিজ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলো।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম মনে করেন, ‘ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে এখন যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলোর তদন্ত যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তার জন্য আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করতে পারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য এটা প্রয়োজন। সবাই যাতে ন্যায়বিচার পায় তার নিশ্চয়তা দেয়া দরকার।

ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো আলাদা নজরদারি ও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘মামলা মামলার গতিতে চলবে। মামলা হচ্ছে, আইনে যেভাবে আছে সেভাবেই তদন্ত হবে। এরজন্য আলাদা তো কিছু করার দরকার নাই। সব মামলারই তদন্ত হচ্ছে।’

আর সিনহা হত্যার পর ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে এত মামলা হচ্ছে কেন সে ব্যাপারে তার ধারণা নেই বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সূত্র: ডয়চে ভেলে, বিডিজার্নাল।

পাঠকের মতামত: