কক্সবাজার, রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০

চট্টগ্রামে রোহিঙ্গারা কৌশলে সংগ্রহ করছে পাসপোর্ট!

রতন কান্তি দেবাশীষ, চট্টগ্রাম::

চট্টগ্রামে রোহিঙ্গারা পেয়ে যাচ্ছে পাসপোর্ট। একটি সিন্ডিকেটের সহায়তায় অবৈধভাবে তৈরি বৈধ কাগজপত্র দিয়ে তারা এ পাসপোর্ট পাচ্ছে। গত এক বছরে চট্টগ্রামে পাসপোর্ট করতে এসে ধরা পড়েছে ৫০ রোহিঙ্গা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ অফিসে ধরা পড়ে ওবাইদুল হক নামে এক রোহিঙ্গা।

তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জাতীয়তা সনদও ছিলো। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর সীতাকুণ্ডের লতিফপুর এরাকার ঠিকানা দিয়ে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে মোহাম্মদ ফয়সল নামে এক রোহিঙ্গা। আবেদনে জমা দেন অনলাইন জন্ম নিবন্ধন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তার সনদও।

কিন্তু আঙ্গুলের ছাপ দিতে গেলে তা মিলে যায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ডাটাবেইসে থাকা একটি ছাপের সঙ্গে, প্রমাণ হয় সে রোহিঙ্গা। এ ভাবেই জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয়তার সনদের মতো শর্তগুলো পূরণ করেই পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা।

ভুয়া নাম-ঠিকানা নিয়ে সিটি কর্পোরেশন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে এই সনদ নিয়ে আসছে তারা। ফলে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের ভিড়ে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।তারপরও কথায় সন্দেহ হলে কিংবা রোহিঙ্গা ডাটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে পাসপোর্টের ভুয়া আবেদন শনাক্ত করা হচ্ছে। ধরাও পড়ছে প্রতিনিয়ত।

পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট করতে আসে তাদের প্রত্যেকেরই ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নেয়া সনদ থাকে। সুক্ষ্মভাবে ধরতে না পারলে তারা ধরাও পড়ে না।

শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে থাকা ১১ লাখ রোহিঙ্গাদের ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পাওয়ার কিছু ঘটনা আগেও ঘটেছিল। তখন সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলা হচ্ছিল।

কিন্তু সম্প্রতি এক সঙ্গে অনেক ঘটনা ধরা পড়ার স্পষ্ট হয়, সেই সতর্কতায় কাজ হয়নি। চট্টগ্রামের দুটি পাসপোর্ট অফিসের মধ্যে মনসুরাবাদ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের অধীনে হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও সন্দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দারা পাসপোর্টের আবেদন করতে পারেন।

এছাড়া মহানগরীর ডবলমুরিং, বন্দর, পতেঙ্গা, বায়েজিদ বোস্তামী, পাহাড়তলী, হালিশহর ও আকবর শাহ থানা এ কার্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে পাঁচলাইশের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের অধীনে বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী উপজেলা এবং নগরীর কোতোয়ালি, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ ও কর্ণফুলী থানা এলাকা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক আবু সাইদ বলেন, রোহিঙ্গাদেও ব্যাপারে আমাদের অবস্থান খুবই কঠোর। আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকি। একজন রোহিঙ্গাও যাতে পাসপোর্ট না পায় সে জন্য সকল পদক্ষেপ নেয়া আছে। আমাদের সন্দেহ হলেই নানা কৌশলে বের করার চেষ্টা করি। ধরাও পড়ছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের পাসাপোর্ট আবেদনের সাথে জন্ম নিবন্ধন, জাতীয়তা সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিচ্ছে। এগুলো ভুয়া নয়, কথাবার্তায় সন্দেহ হলে শনাক্ত করতে পারি। রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করানোর সাথে জড়িত একটি সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটে জনপ্রতিনিধি, নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাভেল এজেন্ট মালিক-কর্মচারী। এ সিন্ডিকেট জাতীয় পরিচয়পত্র, জাতীয়তা সনদসহ সমস্ত কাগজপত্র যোগার করে দেয়। তারপরই পাসপোর্ট করতে আসে তারা।

বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবু সাইদ বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে জন্ম, জাতীয়তা সনদ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে না পারে সে জন্য মাঠপর্যায়ের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে সনদ দেয়ার আগে তার দেয়া তথ্য ঠিক আছে কি-না, সেটা জনপ্রতিনিধিরা যাচাই করে নিলে সহজেই রোহিঙ্গারা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবে না।

এদিকে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট আবেদন ঠেকাতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান পাসপোর্ট কর্মকর্তারা।

পাঁচলাইশ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাসুম হাসান বলেন, রোহিঙ্গা সন্দেহ হলেই কাগজপত্র যাচাই করি। পরে তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। ফিঙ্গার প্রিন্টও মিলে যায়। তাতেই ধরা পড়ে যায়।

চট্টগ্রামে পাসপোর্ট করতে আসা এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করা হয়েছে, যার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও জাতীয়তা সনদও ছিলো। গত বৃহস্পতিবার পাঁচলাইশ আঞ্চলিক কার্যালয়ে ধরা পড়ে ওবাইদুল হক নামে এক রোহিঙ্গা।

লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে তার এনআইডি তৈরি করে সে। তবে তার এনআইডিটি জাল বলে জানিয়েছেন জেলা নির্বাচনি কর্মকর্তা।

পাঠকের মতামত: