কক্সবাজার, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ: পরিবেশের সাথে সমন্বয় আহ্বান পরিবেশবিদদের

এনায়েত উল্লাহ::

উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য এবং মানবতার দিকে মনোনিবেশ করে কর্তন করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব গাছ। এতে করে প্রকৃতি যেমন রাগান্বিত হচ্ছেন, সাথে সাথে বন্যপ্রাণী এবং মানুষের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে দ্বন্দ্ব।

নতুন করে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেললাইন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এটা যদি পরিবেশের সাথে সমন্বয় করে না করা যায়, তাহলে রেলপথটি মানুষ, পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণীর জন্য হয়ে যাবে হুমকি স্বরূপ।

সুতরাং এর সাথে সম্পর্কযুক্ত সবাইকে পরিবেশের সাথে সমন্বয় করে রেলপথ স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। তারা মনে করেন, রেলপথ যেমন পরিবেশবান্ধব অর্থাৎ পরিবেশের জন্য তুলনামূলক কম ক্ষতিকর।

পাশাপাশি গাছ, বন্যপ্রাণীও পরিবেশবান্ধব। সুতরাং সমন্বয় করে আমাদের উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

বিগত কয়েক বছর যাবত দেখা যাচ্ছে যে, বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ছে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের কারণে অন্তত ২১টি স্থানে পড়বে হাতির বসতি এবং চলাচলের পথ।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২০০৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ২৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবার একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৬২টি। এছাড়াও গত ৯ মাসে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের বনাঞ্চলে ১২টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

যে কারণে এ রেলপথ স্থাপনের পূর্বেই যে সমস্ত জায়গা দিয়ে হাতি চলাচল করে সে পথে যেন হাতি চলাচলের জন্য আলাদা টানেল করা হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান।

তিনি আমার সংবাদকে আরও বলেন, ট্রেন তুলনামূলক বায়ু দূষণ কম করে। সে হিসেবে এটা পরিবেশবান্ধব এবং উন্নয়নের জন্য এটা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের উন্নয়নের সাথে পরিবেশকে সমন্বয় করতে হবে। উন্নয়নের জন্য যেটুকু ক্ষতি না করলেই নয় এটুকু করে উন্নয়ন করতে হবে।

পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতি না হয় সে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। কারণ এটা আমাদের পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী। পাশাপাশি গাছ কর্তনের ক্ষেত্রেও আমাদের মাথায় চিন্তা রাখতে হবে যেন কম গাছ কেটে এ পথ তৈরি করা যায়।

পরিবেশবিদরা বলেন, একের পর এক বনাঞ্চল ধ্বংস করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং রোহিঙ্গাদের কারণে বিশাল বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ছে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব।

আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের কারণেও বাধাগ্রস্ত হবে ছয়টি করিডর। চলাচলের করিডর বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং খাবার সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বিপন্ন এশিয়ান হাতি।

ফলে বাড়ছে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বও। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ফরেস্ট (আইইউসিএন) প্রকাশিত বিপন্ন প্রাণীর লাল তালিকায় আছে এশিয়ান এলিফ্যান্ট।

হাতি নিয়ে কাজ করা আইইউসিএন বলেন, এশিয়ান হাতিগুলো মিয়ানমার এবং ভারতে আসা-যাওয়া করে। মিয়নমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের কারণে বনভূমি উজাড় হওয়া, সীমান্তে মাইন পোঁতা এবং বনের জায়গায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে হাতি চলাচলের করিডর।

তাছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের ফলে সংরক্ষিত বন যেমন ভাগ হবে, তেমনি হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীও হুমকিতে পড়বে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রায় ২৭ কিলোমিটার বন্যহাতির জন্য মরণফাঁদে পরিণত হবে। ওই রেললাইনের অন্তত ২১টি স্থানে পড়বে হাতির বসতি এবং চলাচলের পথ।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের ১২৮ কিলোমিটারের মধ্যে ২৭ কিলোমিটারের মতো পড়ছে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাইস্যাখালী (ফাঁসিয়াখালী) বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কের ভেতর। তবে রেল বিভাগ থেকে হাতি ও বন্যপ্রাণী চলাচলের জন্য আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ করার কথা বলা হচ্ছে।

দেশের অন্যতম তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, এবং মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কের ২৭ কিলোমিটার বনাঞ্চলসহ ১২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন। ১৬ হাজার ১৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ডুয়েল গেজ এ রেললাইন নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২২ সালে।

এর মধ্যে চুনতি দিয়ে যাবে ১৫.৮ কিলোমিটার, ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য অঞ্চল দিয়ে ১০.৩ কিলোমিটার এবং দশমিক ৯ কিলোমিটার পথ যাবে মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কের মধ্য দিয়ে।

দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের আওতায় দাতা সংস্থা এডিবির যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইল্ড লাইফ কনসালট্যান্ট নরিস এল. ডোড এবং একই সংস্থার বাংলাদেশের ন্যাশনাল এনভাইরোনমেন্টাল কনসালট্যান্ট আসিফ ইমরান যৌথভাবে গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দুটি সার্ভে পরিচালনা করা হয়। প্রথমটি ২০১৭ সালের ৮-১৫ এপ্রিল, দ্বিতীয়টি ৩১ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর।

ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে চুনতিতে ১১টি, ফাঁসিয়াখালীতে সাতটি এবং মেধাকচ্ছপিয়াতে দুটি ক্যামেরা বসানো হয়। প্রায় সাত মাস ধরে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এসব ক্যামেরা। গবেষণায় তিনটি বনাঞ্চলের ২১টি স্থানে হাতির চলাচলের পথ এবং আবাসস্থল পাওয়া যায়।

এর মধ্যে ১৩টি স্থান চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে, সাতটি ফাইস্যাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ও একটি মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্কে। চুনতিতে ১৩টির মধ্যে ৯টিতে উভয় মৌসুমে হাতির আনাগোনা দেখা যায়। ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের জন্য চুনতিতে ১১টি, ফাইস্যাখালীতে সাতটি ও মেধাকচ্ছপিয়াতে দুটি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল।

দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৪৭টি হাতি আছে এখানে। মোট হাতির ৫৭ শতাংশের দেখা মেলে এ বনে। দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী ও হাতির চলাচলের কথা মাথায় রেখে আমরা ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করছি। জীববৈচিত্র্যের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য আমরা প্রকল্প শেষ হলে সাত লাখ গাছের বনায়ন করবো।

এদিকে গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি হাতি রয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে। এখানে হাতি রয়েছে ৬৫টি। কক্সবাজার দক্ষিণে ৫৪টি, উত্তরে ৬৩টি, লামায় ৩০টি, বান্দরবানে ১১টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তরে ২৮টি এবং দক্ষিণে ১৭ হাতি রয়েছে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বৃহত্তর চট্টগ্রামে হাতির আক্রমণে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত নভেম্বর মাসে লোকালয়ে হাতির আক্রমণে বোয়ালখালীতে পাঁচজন এবং লোহাগাড়ায় একজনের মৃত্যু হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রেললাইন নিয়ে যাওয়ার নজির নেই।

বর্তমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের পাশ দিয়ে এ রেললাইন নিয়ে যাওয়া হলে কোনো সমস্যা হতো না। ভারতে বনের ভেতর দিয়ে সামান্য পরিমাণ রেললাইন হলেও তাতে দুর্ঘটনায় হাতি মারা যাওয়ার নজির আছে।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণী গবেষক আলম শাহীন আমার সংবাদকে বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রেলপথ করা হলে বন্যপ্রাণীর সমস্যা তো হবেই। তারপরও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থামিয়ে রাখা যাবে না।

সে কারণে বিকল্প পথ বেছে নিলে ভালো হয়। কারণ এ রাস্তা দিয়ে যখন ট্রেন চলবে তখন হর্ন, ট্রেনের ধোঁয়া এবং চলাচলের শব্দের কারণে বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে। আমরা রেলপথের বিরোধী নই।

তবে যেহেতু বিকল্প পথের সুযোগ রয়েছে সে কারণে বিকল্প চিন্তা করার আহ্বান জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সবুজ আন্দোলনের চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার আমার সংবাদকে বলেন, চলমান বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা ও পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বন অধিদপ্তর। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তাদের তৎপরতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তবে শিগগিরই এ অবস্থার উন্নতি না হলে বন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে বাধ্য হবো আমরা।

এমনিতেই বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে বন বিভাগ উদাসীন। এখন যদি রেলপথ করা হয় তাহলে আরও বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। সুতরাং বিকল্প চিন্তা করুন। অথবা আন্ডারপাসসহ যে সমস্ত শর্ত রয়েছে রেলপথ নির্মাণের তার সব যেন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বাস্তবায়ন করা হয় সে আহ্বান জানাচ্ছি।

বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, প্রতিনিয়ত হত্যা করা হচ্ছে বন্য হাতি। হরহামেশাই হাতি, ডলফিন, বানর, পাখি, ব্যাঙ, সাপসহ বিভিন্ন বন্য প্রজাতিকে শিকার, হত্যা ও পাচার করছে কতিপয় দুর্বৃত্ত। প্রতিনিয়ত অবাধে এসব প্রাণীকে হত্যা করা হলেও বন কর্মকর্তা কিংবা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

তিনি বলেন, গত তিনদিনে পরপর তিনটি হাতির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে দেশের বনাঞ্চলে। এর আগে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ডজনখানেক ডলফিনের মরদেহ। যা আমাদের জন্য অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বন বিভাগে। অথচ তাদের উচিত ছিলো জাতির কাছে এসব ঘটনার কারণ স্পস্ট করা এবং ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত ৯ মাসে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের বনাঞ্চলে ১২টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। তার বিপরীতে মৃত প্রাণীকে পুঁতে ফেলা, খুব বেশি চাপে পড়লে দায়সারা ময়নাতদন্ত বা একটি মামলা করা ছাড়া কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। যা আমাদের ভাবাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে চলমান প্রকল্পগুলোর টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে জানতে চেয়ে তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে বন ও প্রাণী।

এখন অবশ্যই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এসব টাকা কি সত্যি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যয় হচ্ছে নাকি কারো পকেটে যাচ্ছে। নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে বন মন্ত্রণালয়কে এসব বিষয় জাতির সামনে খোলাসা করতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

পাঠকের মতামত: