কক্সবাজার, রোববার, ২২ নভেম্বর ২০২০

চট্টগ্রাম হয়ে সারা দেশে যাচ্ছে ইয়াবার চালান

রতন কান্তি দেবাশীষ::

টেকনাফে ওসি প্রদীপ কাণ্ড, সাঁড়াশি অভিযান, আত্মসমর্পণ ও বন্দুকযুদ্ধ কিছুই থামাতে পারছে না ইয়াবা পাচার। সবকিছু ছাপিয়ে প্রতিদিনই কোটি কোটি টাকার ইয়াবা পাচার হচ্ছে।

কিছু চুনোপুঁটি বন্দুকযুদ্ধে নিহত ও গ্রেপ্তার হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে ‘ডন’রা। চট্টগ্রামকে ব্যবহার করা হচ্ছে মূল রুট হিসেবে। চট্টগ্রামে আনার পর সুযোগ বুঝে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। নিত্যনতুন কৌশলে পাচার হচ্ছে ইয়াবা।

২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারাদেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে সরকার। এতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় ক্রসফায়ারের পরিসংখ্যান। গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৮৭ জন।

এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ১৭৪, বিজিবির সঙ্গে ৬২ ও র্যাবের সঙ্গে ৫১ জন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আর টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৬১ জন। টেকনাফে কাউন্সিলর একরাম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এরপরই থমকে যায় অভিযান।

কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো শুরু হয় ইয়াবা কারবার। টেকনাফে ওসি প্রদীপের সহায়তায় ইয়াবা ডনরা আবারো পাচার শুরু করে। ইয়াবার মূল কেন্দ্র কক্সবাজারে দুই দফায় ১২৩ ইয়াবাকারবারি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে শপথ নেয় জীবনে আর এ কারবারে জড়াবে না বলে।

কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। বন্ধ হয়নি ইয়াবার লেনদেন। জানা গেছে, প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে দেশে ঢুকছে বড় বড় চালান। চেনা পথগুলো বদলে নতুন পথ দিয়েই সেগুলো আনছে চোরাচালানিরা।

অনেকে বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান লোক দেখানো। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের অভিযান কিংবা গৃহীত অন্য কর্মসূচির কারণে ইয়াবাপাচার অনেকটাই কমে এসেছে।

গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ মোহাম্মদ খান।

এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে টেকনাফ থানায়। গ্রেপ্তার হয়েছেন টেকনাফ থানার আলোচিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। এ ঘটনার পর আইন  শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত থাকায় বেড়ে গেছে ইয়াবা পাচার।

ইয়াবা পাচারে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারের কারবারিরা তাদের বাকিতেও কোটি কোটি টাকার ইয়াবা দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা সেগুলো বিক্রি করেই পরিশোধ করছে টাকা।

আর পাচারে প্রতিদিনই ব্যবহার হচ্ছে নিত্যনতুন কৌশল। গত কয়েক মাস ধরে বড় বড় ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব রুটে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে অনেক চালান জব্দও করেছে। গত দুই মাসে অন্তত ১৫ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করা হলেও পাচার হয়েছে এর কয়েকগুণ বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, স্থলপথে কড়াকড়ি আরোপ করায় ইয়াবা কারবারিরা এখন সরাসরি সমুদ্র পথকে বেছে নিয়েছে। মিয়ানমার থেকে চালান আসে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে। এ ছাড়া মহেশখালী-কুতুবদিয়া গভীর সমুদ্র চ্যানেল ব্যবহার করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও খুলনায়ও পাচার হচ্ছে ইয়াবার চালান।

সূত্র জানায়, কক্সবাজার থেকে আনার পর চট্টগ্রামে গুদামে রাখা হয়। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে কৌশলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হয় ইয়াবা। বিশেষ করে পতেঙ্গায় প্রতি রাতে খালাস করা হয় লাখ লাখ ইয়াবা।

চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ইয়াবা নিয়ে পুলিশ কঠোর অবস্থানে। ইয়াবাকারবারিদের ছাড় দেয়ার সুযোগ নাই। ইয়াবার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। প্রতিনিয়তই ইয়াবা জব্দ হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি এলাকা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। ইয়াবা কারবারি যেই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের সর্বশেষ তালিকায়, কক্সবাজারে ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১ হাজার ২৫০ জন। এর মধ্যে শুধু টেকনাফেই রয়েছে ৯১২ জন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজারের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি আছে ৭৩ জন।

তবে তালিকাভুক্ত বড় বড় গডফাদার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে তাদের মাধ্যমে ইয়াবা বড়ি দেশে প্রতিদিনই ঢুকছে। শুধু বদল হচ্ছে গডফাদার আর পাচারকারী।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরে চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, ইয়াবাসহ সকল প্রকার মাদক ব্যবসা বন্ধে আমাদের অবস্থান খুবই কঠোর। প্রতিদিনই আমাদের অভিযান চলে। কাউকে ছাড় দেয়া হয় না। বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধার হয়েছে। গ্রেপ্তারও হচ্ছে মাদককারবারিরা।

পাঠকের মতামত: