কক্সবাজার, শনিবার, ১৯ জুন ২০২১

২০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি পর্যটন খাতে

টিকে থাকার লড়াইয়ে হোটেল-রিসোর্ট

দেশে দেশে করোনার ঢেউ। প্রাদুর্ভাব রোধে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধ। কোনো কোনো দেশ তাদের নাগরিকদের বিদেশযাত্রাতেই জারি করেছে নিষেধাজ্ঞা। এতে করে ব্যবসা হারাচ্ছে পর্যটন সংস্থাগুলো। ভয়াবহ ক্ষতির মুখে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিও। স্বাভাবিক সময়ে বিদেশি অতিথি, পর্যটক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে মুখর থাকত তারকা হোটেলগুলো। কিন্তু গত বছর দেশে করোনা আঘাতের শুরু থেকে হোটেলগুলোতে নেমে আসে সুনসান নীরবতা। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবারও অনিশ্চয়তায় ডুবছে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প।

বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আপাতত ঢাকায় আসা সীমিত। তারকা হোটেলগুলো তাই অনেকটা ফাঁকা। আবাসনের ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি হোটেলের ভেন্যু ভাড়া নেওয়াও কমেছে। এতে করে অনেক হোটেল বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে।

করোনার আঘাত সামলিয়ে গত বছরের শেষের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলেও গত এপ্রিল থেকেই শূন্যতা তৈরি হয়েছে হোটেল-রিসোর্টে। জীবিকা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, এয়ারলাইন্স, পর্যটক পরিবহন, ক্রুজিং ও গাইডিং সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪০ লাখ পেশাজীবী। এ খাতে দৈনিক ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। বলা হচ্ছে- করোনার দুর্যোগ কেটে গেলেও এর ধকল সামলে উঠতে পর্যটন খাতের অন্তত কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

‘বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে করোনা ভাইরাসের প্রভাব থেকে দ্রুত উত্তরণে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক ওয়েবিনার আয়োজন করে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)। গতকাল বিকালে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, গত বছরের করোনার কারণে পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুধু টোয়াব সদস্যদেরই ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ থেকে সবকিছু স্থবির হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে। জুন পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি থাকলে ট্যুর অপারেটরদের ক্ষতি হবে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর সেটা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত হলে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে।

টোয়াবের আলোচনায় এফবিসিসিআইর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘সীমিত পরিসরে হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেওয়া যেতে পারে পর্যটনকেন্দ্র। প্রয়োজনে পর্যটকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। পাশাপাশি লকাডাউনের কারণে বন্দিদশা থেকে মানসিক প্রশান্তির জন্য হোটেল-রিসোর্টগুলোও খুলে দেওয়া যেতে পারে। হোটেল-রিসোর্ট চালু রাখা মানেই করোনা সংক্রমণ, এমনটি কিন্তু নয়। যেহেতু সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে রেস্তোরাঁ চালু রাখার অনুমতি দিয়েছে। তাই আমি মনে করি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করা যেতে পারে হোটেল-রিসোর্টও।’

টোয়াব সভাপতি ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের গভর্নিং বডির সদস্য মো. রাফেউজ্জামান বলেন, ‘পর্যটন খাত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমরা এখন পর্যন্ত কোনো প্রণোদনা পাইনি। ব্যাংকগুলোতে আবেদন করেও কোনো ঋণ নিতে পারিনি। কারণ ট্যুর অপারেটর ও ট্রাভেল খাতকে ব্যাংকগুলো রিস্ক সেক্টর হিসেবে বিবেচনা করে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও পর্যটন খাতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। আবার গত বছরের ক্ষতির মধ্যেই চলতি বছর শুরু হয়েছে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। এ অবস্থায় জীবিকা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় এ সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪০ লাখ পেশাজীবী।’

করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের ১৮ মার্চ থেকে কক্সবাজারসহ দেশের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছিল প্রশাসন। পরবর্তী সময়ে ১৭ আগস্ট থেকে স্বাস্থ্যবিধিসহ নানা নির্দেশনা মানার শর্তে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তবে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে আবার সব পর্যটন স্পট ও বিনোদনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। যদিও কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জরুরি প্রয়োজনে অতিথি থাকতে পারছে। তবে সেটি দিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশের মোট জিডিপির ৫৫ শতাংশের বেশি সেবা খাতের। জিডিপির মতো কর্মসংস্থানেরও বড় অংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। সেবা খাতের কিছু উপখাত অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বৃহৎ অংশই পার করছে নাজুক পরিস্থিতি। হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, ক্লিনিক, এভিয়েশন, ট্রাভেল এজেন্সি, পর্যটনের অন্য সব প্রতিষ্ঠানকে সেবা খাত হিসেবেই বিবেচনা করে ব্যাংকগুলো। পরিসংখ্যান বলছে, এসব খাতে দেশের ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। করোনার প্রথম ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর শীর্ষে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পর্যটন ও পরিবহন। টোয়াব জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেবা খাতকে টিকিয়ে রাখতে গত বছর সংগঠনের পক্ষ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ১৬ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আপৎকালীন সেই প্রস্তাবে টোয়াব সদস্যদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় পরবর্তী দুই বছরের জন্য সহজ শর্তে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ ছিল, যা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

জানা গেছে, ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ছিল গত বছর। ওই সময় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে এ খাতগুলোর নাম উঠে এসেছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায়ও সবার আগে বন্ধ হয় যাত্রী পরিবহন। তাতে স্থবির হয়ে পড়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন খাতের সব ব্যবসা। কক্সবাজারসহ পুরোপুরি বন্ধ দেশের অন্য সব পর্যটন এলাকার হোটেল-মোটেলও। কক্সবাজারে শুধু হোটেলগুলোয় ৪০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। বর্তমানে তার ১০ ভাগের এক ভাগও নেই। হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, মহামারীতে ব্যবসা বন্ধ থাকলেও প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে দেশের সেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের দেউলিয়া হওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। অনেকেই কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না। তাই কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হোটেল, রিসোর্টগুলোর গত এক বছরের ব্যাংক ঋণের সুদকে ব্লক হিসেবে স্থানান্তরের দাবি জানান এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ঋণের সুদের ওপর সুদ আরোপ বন্ধ করা দরকার। তা না হলে পর্যটন খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। গত এক বছরের ঋণের সুদ পৃথক করে অন্য একটি হিসাবে রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। ঋণ পরিশোধের কিস্তির সময়সীমা বাড়িয়ে দিলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকও উপকৃত হবে।

হোটেল ব্যবসার অবস্থা নিয়ে গত বছর জরিপ প্রকাশ করে ভ্রমণবিষয়ক পাক্ষিক ‘বাংলাদেশ মনিটর’। তাদের জরিপে হোটেল অতিথিদের ৬২ দশমিক ২ শতাংশই ছুটি উপভোগকারী ও পরিবারসহ অবকাশযাপনকারী, ব্যবসায়িক ভ্রমণকালে হোটেলে থাকছেন ৩১ দশমিক ১ শতাংশ এবং বাকিরা কাজ ও অবকাশ উভয় উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করছেন। ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত হোটেলে থাকার কথা ভাবছেন না, ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ আগামী তিন মাস বা তারপর হোটলে থাকার কথা বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে ৩১ দশমিক ১ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর এই মুহূর্তে হোটেলে থাকতে কোনো আপত্তি নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণকালে ৭১ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ এখন হোটেলে থাকাটাকেই পছন্দ করেন, ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ আত্মীস্বজনের বাসায় আর বাকিরা বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে চান। হোটেলে অবকাশ যাপনকারীদের মধ্যে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ বাজেট হোটেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন, ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ চার কিংবা পাঁচ তারকা হোটেল আর বাকিরা বুটিক হোটেলকে বেছে নিতে চান।

মহামারীকালে হোটেলগুলোর স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি প্রটোকল নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সন্তোষজনক নয় বলে জানান, ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ যথেষ্ট ভালো বলে মনে করেন, তবে ২২ দশমিক ২ শতাংশ এ বিষয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নন। ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করেন ব্যবসা পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে হোটেলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভ্রমণে মানুষের আস্থা কমে যাওয়া, ২৬ দশমিক ৭ শতাংশের মতে বিদেশিদের আগমনে ভাটা এবং ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্দার কথা উল্লেখ করেন।

বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রহণকারী মনে করেন হোটেলগুলোর প্রমোশনাল রেটসহ অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন, ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ উদ্ভাবনী ব্যবসা কৌশলের কথা বলেছেন। অন্যদিকে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ মনে করেন হোটেলগুলোকে ব্যাপক প্রচারণা ক্যাম্পেইনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চালানো জরিপে অংশ নেন বিভিন্ন পেশা ও বয়সের মোট ২ হাজার ১৪৮ জন।

জানা গেছে, পর্যটন খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড। একইভাবে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও হোটেল সোনারগাঁও কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া পর্যটকদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে তাদের অবস্থা ও সুপারিশ তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার কারণে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেল, মোটেল, বার ও রেস্তোরাঁগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সরাসরি ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া সংস্থার লিজগ্রহীতারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এ বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর আয়ের ব্যবধান মাসভিত্তিক তুলে ধরে পর্যটন করপোরেশন। সেটি যোগ করলে দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় ক্ষতি ৪৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এখন ক্রাইসি ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও মনিটরিং কমিটি গঠন করেছে পর্যটন করপোরেশন। ইউনিট পর্যায়ে ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি ও ভ্রমণে সাশ্রয়ে করপোরেশনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ৫০ ভাগ ছাড়ে আটটি হোটেল-মোটেলে স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে।

হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (হিল) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল গত বছরের ২৫ মার্চ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। এ সময়ে ২৫ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৫৯ টাকা হোটেল কার্যক্রমের ক্ষতি হয়েছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর এই সাত মাসে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে ১৬ কোটি ২০ লাখ ৩০ হাজার ৫৯৪ টাকা। আর সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবে ৪১ কোটি ৭৬ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৩ টাকা দেখিয়েছে হোটেল সোনারগাঁও কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড লিখিতভাবে জানিয়েছে, ইনবাউনড ট্যুর অপারেশনে ক্ষতির পরিমাণ ১৮৬ দশমিক ২৫ কোটি টাকা; আউটবাউন্ড ট্যুর অপারেশনে ক্ষতির পরিমাণ ৩৩৯ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা; ডোমেস্টিক ট্যুর অপারেশনে ক্ষতি ৯৩ দশমিক ৩৪ কোটি টাকা; টিকেটিংয়ে ক্ষতি হয়েছে ৩০৫ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা; কর্মহীন অবস্থায় অফিস ভাড়ায় ক্ষতি ১৬ দশমিক ৯৫ কোটি; কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় ৮০ দশমিক ২৭ কোটি টাকা; হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউস, রিসোর্ট, ট্যুরিস্ট কোচে ক্ষতি হয়েছে ৪৮৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশন (বিহা) বলছে, জানুয়ারি থেকে গেল ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসান দেয় ইন্টারন্যাশনাল হোটেলগুলো। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা। তাই আসন্ন বাজেটে এ খাতকে সম্পূর্ণ ট্যাক্সমুক্ত রাখার দাবি জানায় সংগঠনটি। একই সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৭ শতাংশ অথবা সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। সংকট মোকাবিলায় ৫০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখারও দাবি জানানো হয়।

পাশাপাশি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করায় অন্য খাতের মতো ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা চায় সংগঠনটি। এ প্রসঙ্গে বিহা সভাপতি এইচএম হাকিম আলী আমাদের সময়কে বলেন, ‘বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে পর্যটন ও ইন্টারন্যাশনাল হোটেল খাত সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ খাতের প্রায় পুরোটাই আসে বৈদেশিক আয় থেকে। করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ থাকায় দেশে আর বিদেশিরা আসছেন না। হোটেল ভাড়া হচ্ছে না। একদিকে হোটেলের খরচ, কর্মচারীদের বেতন অন্যদিকে ব্যাংক ঋণ সব কিছু মিলিয়ে মালিকরা দিশাহারা। সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য খাতে প্রণোদনা দেওয়া হলেও পর্যটন ও হোটেল খাত এ সহায়তা থেকে পুরোই বঞ্চিত।’

এদিকে কেবল দেশীয় হোটেল-রেস্তোরাঁয় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘করোনার কশাঘাতে সারাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যায়। অর্ধেক মালিকানা বদল হয়েছে। শ্রমিকদের প্রণোদনা সুবিধা এবং মালিকদের এসএমই খাত থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার পাশাপাশি ঘর ভাড়া, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করতে হবে।’ ইমরান হাসান বলেন, ‘সব বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলা শহর মিলে হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৬০ হাজার। এতে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩০ লাখ। সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে প্রায় ২ কোটি মানুষ নির্ভরশীল। এতগুলো মানুষ এখন বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যান্ড হোটেলস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব বুলবুল আমাদের সময়কে বলেন, ‘দেশের পর্যটন ও হোটেলগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জড়িত। করোনাকালে সব বন্ধ থাকায় হোটেল মালিকরা তাদের মতো করে দুয়েক মাসের বেতন দিয়ে কর্মচারীদের বিদায় দিয়েছেন। এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে।’ তিনি বলেন, ‘এ খাত অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় কর্মচারীদের কোনো অভিভাবক নেই। সরকারের কেউ দায় নেয় না। তাই আমরা জোর দাবি জানাই, পর্যটন ও হোটেল খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করার পাশাপাশি এ খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।’

পাঠকের মতামত: