কক্সবাজার, শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১

ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট : পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

বর্ধিত আয়কর অবিলম্বে বাতিল, ভারী মোটরযান চালকদের সহজশর্তে সরকারি ফি’র বিনিময়ে অবিলম্বে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানসহ ১৫ দফা দাবিতে ডাকা ৭২ ঘণ্টার কর্মবিরতির প্রথম দিনে অচল হয়ে পড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানির সাপ্লাই চেইনও একই কারণে ভেঙে পড়তে পারে।
কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্যপরিবহন মালিক এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ফেডারেশনের যৌথ আহ্বানে ডাকা কর্মবিরতি চলাকালে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন পণ্যবাহী গাড়ির মালিক-শ্রমিকেরা। এ সময় তারা অবিলম্বে দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বানে জানান। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
এদিকে, কর্মবিরতি প্রসঙ্গে চিটাগং চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, পণ্যবাহী গাড়ির মালিক-চালকদের ধর্মঘটে পণ্য পরিবহনে বিরুপ প্রভাব পড়েছে। পণ্যের কাঁচামাল না পেলে কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। তাই এই ধরনের কর্মসূচির কারণে ব্যবসায়ীদের সাথে সাথে সারা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং এই ধরনের কর্মসূচি এড়াতে একটি সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।
বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্যপরিবহন মালিক এসোসিয়েশনের সভাপতি মুকবুল আহমদ বলেন, আমাদের দাবিগুলো হঠাৎ করে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি। আমাদের সুবিধা অসুবিধার কথা জানিয়েছি। সমস্যার কথাও জানিয়েছি। কিন্তু কোন সমাধান পাইনি। উপরন্তু হয়রানির মধ্যে পড়ছি প্রতিনিয়ত। আমরাও চাই না পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন হয়ে দেশ অচল অবস্থায় পড়ুক। এতে সবার ক্ষতি। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ আমাদের যৌক্তিক দাবি অনতিবিলম্বে মেনে নেওয়া হোক।
চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. মাইনুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, ‘পুলিশের চাঁদাবাজি, আয়কর, ড্রাইভারদের লাইসেন্স সহজীকরণসহ ১৫ দফা দাবি আদায়ে আমরা আন্দোলন করে আসছি। দাবিগুলো মেনে না নেওয়ায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ১৫ দফা দাবিতে ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আমরা তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখেছি।’
অচলাবস্থার দিকে চট্টগ্রাম বন্দর : ৭২ ঘণ্টার কর্ম বিরতিতে গতকাল মঙ্গলবার প্রথমদিন কোন প্রকার পণ্য খালাস হয়নি। যেখানে গড়ে প্রতিদিন বন্দর থেকে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টিইইউস কনটেইনার খালাস হয়, সেখানে গতকাল কোন কনটেইনারই খালাস হয়নি। এতে অনেকটা অচল অবস্থায় ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। তবে পণ্য খালাস না হলেও বন্দরের অভ্যন্তরে লোড-আনলোডের কাজ চলমান ছিল বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের অভ্যন্তরে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানে পণ্য লোড হয়েছে তবে পণ্য পরিবহনে কর্মবিরতি চলার কারণে কোন পণ্যবাহী গাড়ি বন্দর ছেড়ে যায়নি। গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরের ৪৯ হাজার ২শ টিইইউস কনটেইনার ধারণ ক্ষমতার বিপরীতে ছিল ৩৭ হাজার ৯৮৬ টিইইউস। তবে কর্মবিরতি যদি চলমান থাকে তবে তিন দিনে আরো প্রায় ১০ হাজার টিইইউস কনটেইনার বন্দরের যুক্ত হতে পারে। ফলে বন্দরের ভেতরে কনটেইনার মুভমেন্টে বড় বিপর্যয় নামতে পারে।
আমদানি-রপ্তানি পণ্য আনা নেওয়া হয়নি বেসরকারি অফডক থেকেও : গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া ৭২ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে দেশের ১৯টি বেসরকারি অফডক থেকেও কোন ধরনের পণ্য পরিবহন হয়নি। প্রতিদিন বেসরকারি অফডকগুলোতে গড়ে যেখানে ৩ হাজার ৩শ থেকে ৩ হাজার ৫শ ট্রাক আমদানি ও রপ্তানি পণ্য নিয়ে আসা যাওয়া করে, সেখানে গতকাল কোন প্রকার ট্রাক প্রবেশ করেনি। এছাড়া বেসরকারি অফডকগুলো থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৮শ থেকে ২ হাজার টিইইউস রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার আসা যাওয়া করে। এছাড়া গড়ে প্রতিদিন ৮ থেকে ৯শ টিইইউস আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার এবং প্রায় ২ হাজার টিইইউস খালি কনটেইনার আসা যাওয়া করে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার টিইইউস কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর ও অফডকগুলোর মধ্যে যাতায়াত করলেও ট্রেইলার ও প্রাইম মুভার কর্মবিরতিতে থাকায় কোন প্রকার কনটেইনারও পরিবহন হয়নি।
তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ : চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানি পণ্য নিয়ে কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে পারেনি, আমদানি পণ্যবাহী কোনো গাড়ি বের হয়নি। যা নিয়ে চরম উদ্বেগে তৈরি হয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোওয়ার্ডার্সসহ সকল বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে।
এদিকে, কর্মবিরতির ফলে পোশাক শিল্পে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিজিএমইএ’ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এস এম মান্নান (কচি) এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা শিল্পের সব কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে অনতিবিলম্বে সড়কপথে পণ্য পরিবহন পরিস্থিতি স্বাভাবিককরণে উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানান।
২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বরও ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির ঘোষণা : পণ্য পরিবহন খাতের ওপর নানাভাবে জুলুম-নির্যাতনের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাতিলসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে আগামী ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বরও সারাদেশে পণ্য পরিবহনে ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, লরি মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ।
ইতিপূর্বে ঘোষিত এই কর্মসূচি সফলে দুপুরে সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির আহ্বান মো. নূরুল আবছারের সভাপতিত্বে নগরীর মাদারবাড়ি এলাকায় সংগঠন কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দেন সংগঠনের নেতারা।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্যপরিবহন মালিক এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ন্যায়সংগত ১৫ দফা দা

পাঠকের মতামত: