কক্সবাজার, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

জনপ্রতিনিধিদের বাগড়া

ডিসেম্বরেই পৌর নির্বাচনের উদ্যোগ

আগামী ফেব্রুয়ারিতে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশের পৌরসভা নির্বাচনে তৎপর রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশন। কিন্তু মেয়ররা চাইছেন পদে থাকতে। তারা দায়িত্ব না ছাড়তে ইতোমধ্যেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। মন্ত্রণালয় ও ইসি আগামী ডিসেম্বরের শেষদিকে এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইসির চাহিদানুযায়ী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনের উপযোগী পৌরসভার তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। শিগগিরই এ তালিকা কমিশনে পাঠাবে।

চলমান আয়োজনের এ মুহূর্তে পৌরসভার মেয়ররা নির্বাচন পেছাতে লবিং ও তদবিরে ব্যস্ত আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ইসির অবস্থান ভিন্ন। তারা বলছেন, নির্বাচিত পৌর জনপ্রতিনিধিরা যেন নির্বাচন ছাড়াই পদে থাকতে চাইছেন। এ যেন ‘মামার বাড়ির আবদার’।

কমিশন থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন পেছাতে পৌর মেয়ররা ইসিতে আবেদন করে সঠিক কাজ করেননি। কারণ নির্বাচিতদের কথায় নির্বাচন পেছনের সুযোগ বা এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। কেননা স্থানীয় সরকারের নির্বাচন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে সম্পন্ন করে থাকে কমিশন। তাই ইসিতে এ ধরনের আবেদন না পাঠিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠালে ভালো করত।

আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কথায় নির্বাচন পেছানোর প্রশ্নই উঠে না। নির্বাচন পেছাতে যে ধরনের ক্রাইটেরিয়া বা পদ্ধতি রয়েছে, সেটার মধ্যে পড়লে ইসি নিজেই নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারবে। স্থানীয় সরকার শুধু নির্বাচন করার উপযোগী পৌরসভার তালিকা দেবে কমিশনকে, এর আলোকে নির্বাচন করবে কমিশন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা দুর্যোগকালে মন্ত্রণালয় ও ইসি পৌর নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন পৌরসভার মেয়ররা। তারা বলছেন, এ সময়ে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রতিফলন ঘটবে না। সংক্রমণের ভয়ে অনেকে ভোটকেন্দ্রে আসার আগ্রহ দেখাবেন না। যেনতেন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে যাবে।

মেয়াদোত্তীর্ণ বেশির ভাগ পৌরসভা থেকে ইসিতে চিঠি পাঠিয়ে অভিমত জানানো হয়েছে। সেখানে করোনার মধ্যে নির্বাচন না করার কথা বলা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আসন্ন শীতে করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের মুখ থেকে এ ধরনের ঘোষণা আসার পর শীত মৌসুমে নির্বাচন আয়োজন কতটুকু যুক্তিসংগত, তা নিয়েও অনেক জনপ্রতিনিধি প্রশ্ন তুলেছেন।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভার মেয়র আবদুর রহমান প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাকে দেওয়া পত্রে উল্লেখ করেছেন, বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে। অনেক দেশ দ্বিতীয়পর্যায়ে লকডাউনের চিন্তা করছে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভয়ে কাঁপছে। ঘরে-বাইরে লোকজন চলাচল এক প্রকার নিষিদ্ধ। ভারতেও করোনা মহামারি আকার ধারণ করেছে। সংসদ সদস্যসহ নির্বাচিত অনেক জনপ্রতিনিধি এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঝুঁকির মধ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম গ্রহণ করলে কোনো প্রার্থী ঘর থেকে বের হতে পারবেন না, আবার ভোটাররাও ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহ পাবেন না। এজন্য দুর্যোগকালীন সময়ে নির্বাচন আয়োজন না করার জন্য অনুরোধ করছি। শুধু আবদুর রহমান একা নন, প্রতিদিনই ইসিতে বিভিন্ন পৌরসভা থেকে আসছে চিঠি। ফেনীর ছাগলনাইয়া পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ মোস্তফা একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনিও করোনার মধ্যে নির্বাচন না করতে অনুরোধ করেছেন। আর চাঁদুপর পৌরসভার মেয়র নাসির উদ্দীন আহমেদ, খুলনার চালনা পৌরসভা মেয়র সনদ কুমার বিশ্বাস, কুড়িগ্রাম পৌরসভা মেয়র আবদুল জলিল রয়েছেন এ তালিকায়।

নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌরসভা নির্বাচন আয়োজন স্থগিত রাখতে অনেক জনপ্রতিনিধি আমাদের কাছে চিঠি দিচ্ছেন। তারা কেন চিঠি পাঠাচ্ছেন তা আমার বোধগম্য নয়। তারা চিঠি দেবেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব বরাবর। নির্বাচন হবে কী হবে না, এটার সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।

আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো জনপ্রতিনিধির কথায় নির্বাচন বন্ধ হয় না। বন্ধ হওয়ার জন্য যে ধরনের নিয়ম রয়েছে, সেটির মধ্যে পড়লে নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবেন, এখন নির্বাচন করা সঠিক হবে কি না। এটা অনেকটা মামার বাড়ির আবদারের মতো শোনা যাচ্ছে। সিনিয়র সচিব আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পৌর নির্বাচন একদিনে না একাধিক দিনে হবে, সে সিদ্ধান্তও নেবে কমিশন।

স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২০ অনুযায়ী, পৌরসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে ভোট গ্রহণ করতে হবে। এই হিসাব অনুযায়ী যেসব পৌরসভার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, সেগুলোতে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে ভোট গ্রহণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এবার মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে ও কাউন্সিলর ও নারী কাউন্সিলর পদে নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হবে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে নির্বাচনযোগ্য পৌরসভা রয়েছে ৩২৮টি। এরই মধ্যে নির্বাচনের উপযোগী রয়েছে ২৫৬টি। তবে এ সংখ্যা কমতে বা বাড়তে পারে। কেননা, মামলাসহ আইনি জটিলতার কারণে বেশ কিছু পৌরসভার নির্বাচন আটকে আছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করে ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় একদিনে ভোট গ্রহণ করা হয়। বেশির ভাগ পৌরসভায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে শপথ নেন মেয়র ও কাউন্সিলররা। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পাঠকের মতামত: