কক্সবাজার, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ: তিন মাসে ক্ষতি দেড় হাজার কোটি টাকা

সারাবিশ্বের মানুষকে মারাত্মক পর্যুদস্ত অবস্থায় ফেলেছে করোনা ভাইরাস। এ মহামারী ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব দেশের অর্থনীতিতে বিষাক্ত ছোবল হেনেছে। সেই ছোবলে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে যেসব খাত সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে পর্যটন অন্যতম। বাংলাদেশের অবস্থাও তথৈবচ। পর্যটন খাতকে খাদের কিনারে ঠেলে নিয়ে গেছে করোনা। এতে করে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৪০ লাখ মানুষ পেশাগত অনিশ্চয়তায় ভুগছে, যার প্রভাব পড়ছে এসব মানুষের ওপর নির্ভরশীল স্বজনসহ দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষের যাপিত জীবনে।

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে এবারের পর্যটন দিবস। আজ রবিবার বিশ্ব পর্যটন দিবস। বাংলাদেশে এ বছর ‘গ্রামীণ উন্নয়নে পর্যটন’ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হবে। দিবসটি উদযাপনের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

এদিকে এ দিবসটিকে ঘিরে দেশের পর্যটন খাতকে বাঁচাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ট্যুরিজম বোর্ড। করোনাকালে চালু হওয়া পর্যটন খাত কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হবেÑ এ ব্যাপারে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে বোর্ড। এসব নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের হুশিয়ারিও এসেছে বোর্ডের তরফে। গত ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড থেকে এ সংক্রান্ত পত্র প্রেরণ করা হয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) জাবেদ আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, কোভিড ১৯-এর কারণে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০ লাখ কর্মী। করোনাকালীন চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত তিন মাসে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। মহামারীতে পর্যটন খাতই প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুনরুদ্ধার হবে সবার শেষে। তাই পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষার জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ চালু করা প্রয়োজন। কোভিড-১৯ চলাকালে পর্যটকদের নিজের ও পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কিছু নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হবে। সে সব নিয়মকানুন সন্নিবেশিত করে তৈরি করা হয়েছে কোভিড-১৯ চলাকালে পর্যটক ও পর্যটন খাতের জন্য অনুসরণীয় নির্দেশিকা।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইনবাউন্ড ও অভ্যন্তরীণ পর্যটনে স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা, পর্যটকদের আস্থা অর্জন, পর্যটনের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমন; সর্বোপরি পর্যটকের বাংলাদেশে ভ্রমণ ও অবস্থান নিরাপদ করার লক্ষ্যে এই নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি ছিল। এই নির্দেশিকা অনুসরণ করা হলে বাংলাদেশের পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা খাতসমূহের ওপর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশের পর্যটনের বিকাশ হবে। এ পরিস্থিতিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কর্তৃক প্রস্তুতকৃত কোভিড-১৯ চলাকালে পর্যটক ও পর্যটন খাতের জন্য অনুসরণীয় নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়।

এদিকে পর্যটকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে সেবা প্রদানে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড। সংস্থাটি মনে করছে, এসওপি প্রতিপালন করা হলে বাংলাদেশের পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা খাতসমূহের ওপর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশের পর্যটনের বিকাশ হবে। একই সঙ্গে কোভিড ১৯-এর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিবর্তিত গাইডলাইন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তিত স্বাস্থ্যবিধির ভিত্তিতে এই নির্দেশনাসমূহ অনুসরণযোগ্য হবে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান চালু করার পর এই নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। হোটেল-মোটেল ও পর্যটন খাতের প্রতিষ্ঠান ও স্থানে এই গাইডলাইন ও স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, তাও মনিটরিং করা হবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২০ উপলক্ষে গতকাল শনিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, সবার প্রচেষ্টায়, সবাইকে নিয়েই দেশের পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাবে। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে সর্বস্তরের জনগণকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের যে সম্পদ আছে, তাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনের সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোভিড ১৯-এর কারণে এতদিন বন্ধ থাকা পর্যটন কেন্দ্রগুলো আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছে। যেগুলো এখনো বন্ধ রয়েছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে সেগুলো আস্তে আস্তে খুলে দেওয়া হবে। পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটক ও পর্যটনের সাথে জড়িত সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এসওপি অনুযায়ী স্থানীয় পর্যটন খাত পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা তত্ত্বাবধানের জন্য জেলা প্রশাসনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, গ্রাম উন্নয়ন নিশ্চিত হলে পর্যটক নিশ্চিতভাবেই গ্রামাঞ্চলে ভ্রমণ করতে যাবেন। পর্যটনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে দেশে পর্যটনবান্ধব সংস্কৃতি তৈরি ও লালন করতে হবে। এ সম্পর্কে জনগণ ও পর্যটন অংশীজনদের সচেতন করার জন্য আমরা কাজ করছি। বর্তমানে দেশে পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠন করার পর দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকরা এখন অনেকটাই নিরাপদ।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) জাবেদ আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, করোনাকালীন সময়ে পর্যটকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে এসওপি প্রণয়ন করা হয়েছে। পর্যটকসহ বিনোদন কেন্দ্র, আকাশযাত্রী, নৌযাত্রীদের জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তুলে ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যটনসংশ্লিষ্টদের কাছে যা (এসওপি) পাঠানো হয়েছে। পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন জারিকৃত এই নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে। এ ছাড়া বিনোদন কেন্দ্র, রেস্তোরাঁ, বারসংশ্লিদেরও এই নির্দেশনা মানতে হবে। নির্দেশের ব্যত্যয় ঘটালে বিনোদন কেন্দ্র, বারের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যেহেতু কোভিড-১৯ একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা, তাই আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে নির্দেশনাগুলোও পরিবর্তন করা হতে পারে বলেও জাবেদ আহমেদ জানান।

এসওপিতে পর্যটকদের জন্য নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে আসা পর্যটক এবং দেশীয় পর্যটক যারা বাংলাদেশের ভেতরে ভ্রমণ করবেন তাদের জন্য এ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। কোনো ট্যুরের জন্য অনলাইন বুকিং এবং অনলাইন অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা, আগমনী ভিসাসংক্রান্ত ঝামেলা এড়াতে বিদেশি পর্যটকদের ভিসা নিয়ে আসতে হবে। ইনবাউন্ড পর্যটকদের ট্যুর বুকিংয়ের আগে ভ্রমণসূচি এবং স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা প্রতিবেদন, পিসিআর রিপোর্ট, কোভিড-১৯ নেই মর্মে প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। হ্যান্ডশেক, আলিঙ্গন এড়িয়ে শুভেচ্ছা জানানো ও গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া ভ্রমণের সময় পরিবহন আসন ব্যবস্থায় শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা নিশ্চিত করা, সেবা গ্রহণের পূর্বে সেবা সরবরাহকারী (হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় পরিবহন, গাইড, স্যুভেনির শপ, পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান ইত্যাদি) এর কোভিড-১৯ প্রোটোকল রক্ষার সক্ষমতা জেনে নেওয়া, যে কোনো লম্বা লাইন, ভিড় এবং এড়াতে ট্যুরের সময়সূচি, প্রবেশের টিকিট, সিট, রাইড ইত্যাদি ক্রয় পূর্বেই নিশ্চিত করা। দলগত ভ্রমণের পরিবর্তে ছোট বা পারিবারিক ভ্রমণ করা। সকল প্রকার জরুরি ওষুধ, কাগজপত্র/ যে কোনো জটিল রোগের রিপোর্ট, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ, ক্রেডিট কার্ড, পোশাক সঙ্গে রাখা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পর্যটকের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ট্যুর ম্যানেজারের সঙ্গে শেয়ার করা। বুফে খাবার এড়িয়ে শারীরিক দূরত্ব কমপক্ষে সাড়ে ৩ ফিট বজায় রেখে খাবার টেবিলে বসা এবং খাবার গ্রহণ করা।

হোটেল-মোটেল ও পর্যটন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোভিড-১৯ চলাকালে পর্যটন সেবা প্রদানের এসওপিতে বলা হয়, বিদেশি পর্যটক এবং দেশীয় পর্যটকদের স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক মান বিবেচনা করে পর্যটন সেবা নিশ্চিত করা। অফিস চালু করার আগে অবশ্যই অফিস জীবাণুমুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে প্রবেশপথে থার্মাল স্ক্যানার/ থার্মোমিটার দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শরীরে তাপমাত্রা পরীক্ষা করে অফিসে প্রবেশ করাতে হবে। অফিস পরিবহন অবশ্যই শতভাগ জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। যানবাহনে বসার সময় ন্যূনতম ৩ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং সবাইকে মাস্ক (সার্জিক্যাল মাস্ক অথবা তিন স্তরবিশিষ্ট কাপড়ের মাস্ক যা নাক ও মুখ ভালোভাবে ঢেকে রাখবে) ব্যবহার করতে হবে। সার্জিক্যাল মাস্ক শুধু একবার ব্যবহার করা যাবে, কাপড়ের মাস্ক সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার করা যাবে। যাত্রার আগে এবং যাত্রাপথে বারবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। খাওয়ার সময় শারীরিক দূরত্ব ন্যূনতম ৩ ফুট বজায় রাখতে হবে। প্রতিবার টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে জীবাণুমুক্তকরণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কর্মচারীকে অসুস্থ হলে তাকে আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

পাঠকের মতামত: