কক্সবাজার, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২০

মুন্নার দুই ভাই নিহতের ঘটনায় ক্যাম্পে উত্তেজনা

দুই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে জিম্মি ৩৪ ক্যাম্পের রোহিঙ্গা

উখিয়া বার্তা ডেস্ক::

আল ইয়াকিন নেতা মাস্টার আবুল কালাম ২৬ আগষ্ট থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়
আরকান রোহ্ঙ্গিা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আল ইয়াকিন গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী
সংঘর্ষ, সর্বশেষ মুন্নার দুই ভাই মাহমুদুল হক ও ফরিদকে উত্তেজিত রোহিঙ্গারা কুপিয়ে হত্যা করেছে ৭ সেপ্টেম্বর।

একই দিনে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে টেকনাফের পশ্চিম হ্নীলা নুর হোসেনের ছেলে নুরুল হুদাকে। নিখোঁজ রয়েছে মুন্না বাবা দ্বীন মোহাম্মদ ও আরেক ভাই ওমর ফারুক। প্রতিশোধ পরায়ন এসব রোহিঙ্গাদের দা, কুড়াল সম্পর্কের কারণে পরিস্থিতি দিনদিন অবনতি হচ্ছে বলে দাবী করেছেন রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা জালাল আহমদ। তিনি বলেন, দুই গ্রুপের নেতাকমর্ীদের গ্রেপ্তার পূর্বক আইনের হাতে সোপর্দ্দ করা না হলে ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোন লক্ষণ নেই।

হাফেজ জালাল আহমদ আরো বলেন, মূলত মুন্না ও আবুল কালাম আরসা গ্রুপের নেতা।
বিভিন্ন কারণে অকারণে মুন্না দল ত্যাগ করে চলে আসার কারণে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ক্যাম্পে আধিপাত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুন্নার দুই ভাইসহ ১৪দিনে ৯ জন নিহত ও ২০ জন রোহিঙ্গা গ্রেপ্তারের পরও ক্যাম্পের উত্তপ্ত পরিবেশের কোন নড়চড় হচ্ছে না।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে অস্ত্রধারী রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণের কারণে সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রাণ
ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। তিনি আরো বলেন, ২৯ বছর ধরে তারা কুতুপালং ক্যাম্পে বসবাস করছেন। তাদের কারণে প্রশাসন বা সরকারের কোন ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়নি। অথচ নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ, আধিপাত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, মাঝিদের মধ্যে বিরোধের জের ধরে ক্যাম্পে অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্প কমিটির সেক্রেটারী মোহাম্মদ নুর জানান, অস্ত্রধারী রোহিঙ্গারা ক্যাম্প কমিটির সভাপতিকে পেছন দিক থেকে কুপিয়ে জখম করেছে। বর্তমানে সে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

আরসা নেতা কালামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরে রোহিঙ্গা নেতা শামশু মাঝি জানান, মাস্টার আবুল কালাম মিয়ানমার আকিয়াব জেলার মংডু থানার নেসার আহমদের ছেলে। কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড শরণার্থী ক্যাম্পে এ ব্লকে বর্তমানে তার অবস্থান। ২০১৬ সালে ১৩ মে ভোর রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মোচনী এলাকায় নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণাথর্ী ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালায় একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। তারা আনসার কমান্ডার মোহাম্মদ আলী হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে ১১ টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, ৬৭০টি গুলি লুট করে নিয়ে যায়। দেশ জুড়ে আলোচিত চাঞ্চল্যকর অস্ত্র লুটের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী খাইরুল আমিন ও মাস্টার আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব সদস্যরা। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সীমান্তের তুমব্রু এলাকার জঙ্গল থেকে লুন্ঠিত অস্ত্রগুলি উদ্ধার করা হয়। প্রায় ৩ বছর কারাভোগের পর গত ২৫ জুলাই বান্দরবান
কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে ওই দুর্ধষ সন্ত্রাসী আবুল কালাম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক রোহিঙ্গা জানান, ইয়াবা চালানের ভাগভাটায়ারাকে
কেন্দ্র করে কালাম মাস্টারকে অপহরণ করা হয়। ২৬ আগষ্ট কুতুপালং আমতলী এলাকা দিয়ে বড় ধরনের ইয়াবার চালান নিয়ে আসছিল রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুন্না গ্রুপ। সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের
নিয়ে চলাফেরা করতে পারার সুবাধে ইয়াবা ডন মুন্না কুতুপালং আনরেজিষ্ট্রার্ড এলাকায় মারকাজ পাহাড়ে অবস্থান করলেও বর্তমানে তার অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুন্নার গ্রুপ দাবী করছে আবুল কালাম মাস্টারের গ্রুপ মুন্নাকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গেছে এবং তার দুই ভাইকে হত্যা করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। অপর দিকে কালাম গ্রুপের দাবী মুন্না গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আবুল কালাম মাস্টারকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধরে নিয়ে গেছে। কালাম-মুন্না নিখোঁজ হওয়ার পর শরণার্থী ক্যাম্পে শুরু হয় দুই গ্রুপের সমর্থিত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তান্ডব। ভয়ে সাধারণ গ্রামবাসী গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম
হয়েছে বলে দাবী করে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তাকে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী
গ্রামবাসী।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির নেতা পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন
চৌধুরী বলেন, গুটি কয়েক চাঁদাবাজ রোহিঙ্গা নেতার কারণে ৩৪টি ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। এসব রোহিঙ্গাদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনা না হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে।

ঘটনার পর দিন কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি
আনোয়ার হোসেন রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ক্যাম্পে আধিপাত্য বিস্তার নামের কোন প্রকার
নৈরাজ্য করা চলবে না। এখানে আধিপাত্য থাকবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তাই নেওয়া হবে। ক্যাম্পে লুকিয়ে রাখা অবৈধ
অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। কোন অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহমেদ সনজুর মোরশেদ বলেন, ইয়াবার টাকা লেনদেন ও
বেচা বিক্রির ভাগাভাগির টাকা দেনাপাওনা নিয়ে প্রতিদিন সংঘর্ষ হচ্ছে। তিনি বলেন, ইয়াবা পাচারকারী যেই হোক আগের তালিকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে তালিকা তৈরি
পূর্বক এসব ইয়াবা কারবারিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

পাঠকের মতামত: