কক্সবাজার, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০

ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ থেকে ৯ দফা দাবি

ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। পঞ্চম দিনে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে মহাসমাবেশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। সেখান থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এসব দাবি পূরণ না হলে বেগমগঞ্জ অভিমুখে লংমার্চের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত শাহবাগে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে এ মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়। মূলত বাম সংগঠনগুলো এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। রাজধানীতে কর্মসূচি নির্বিঘ্নে হলেও রাজশাহীতে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত কর্মসূচি মুখর ছিল ধর্ষণবিরোধী স্লোগান, ব্যানার, বক্তৃতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়।

শাহবাগে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়ের সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে বক্তৃতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন মাসুদ, জাহিদ সুজনসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতারা। মহাসমাবেশে বার্তা পাঠিয়েও অনেকে সংহতি জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক এমএম আকাশ, অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক ড. গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান।

তানজিম উদ্দিন খান বলেন, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা সংগঠিত ভণ্ডামির শিকার। নারীর প্রতি সহিংসতা তারই উদাহরণ। এই অন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থা দূর করতে ধর্ষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে ধর্ষকরা এত দূর্বিনীত হয়ে উঠত না।

বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-মামলা হচ্ছে। তারা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, টিয়ার গ্যাসের শেলের ঝাঁজ যত হবে, আন্দোলন ততই তীব্রতর হবে। সরকার বলছে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হবে। ধর্ষণ বন্ধে শুধু সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেই হবে না, ধর্ষণ স্থায়ীভাবে বন্ধে বিকল্প ব্যবস্থাও ভাবতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স ৯টি দাবি তুলে ধরেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের পদত্যাগ ছাড়া তাদের দাবিগুলো হলো- ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা; পাহাড়-সমতলে আদিবাসী নারীদের ওপর সামরিক- বেসামরিক সব প্রকার যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করা, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতনবিরোধী সেল কার্যকর করা, সিডও সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা ও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইন প্রত্যাহার করা; ধর্মীয়সহ সব ধরনের সভা-সমাবেশে নারীবিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, সাহিত্য-নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করা, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বিটিসিএলের কার্যকারী ভূমিকা নেওয়া ও সুষ্ঠু ধারার সংস্কৃতি চর্চায় সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা; তদন্তের সময় নিপীড়িতের মানসিক নিপীড়ন ও হয়রানি বন্ধে আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ধর্ষণ মামলার সাক্ষ্য আইন বিলোপ করা এবং ডিএনএ আইনকে কার্যকর করা এবং গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।

মহাসমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন অনিক রায়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান। ১১ অক্টোবর একই স্থানে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ১২ অক্টোবর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ১৩ অক্টোবর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ১৪ অক্টোবর নারী সমাবেশ এবং ১৫ অক্টোবর নারীদের সাইকেল র‌্যালি করা হবে। এ সময়ের মধ্যে ৯ দফা আদায় না হলে ১৬ ও ১৭ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ পর্যন্ত লংমার্চ করা হবে।

মহাসমাবেশ বিক্ষোভকারীরা ‘আমার সোনার বাংলায়, ধর্ষকের ঠাঁই নাই’, ‘লাঠির বাড়ি মারবি না, সামলাতে পারবি না’, ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগান দেন। প্রতিবাদী গান, আবৃত্তি এবং নাটকের পর মহাসমাবেশ শুরু হয়। বক্তৃতা শেষে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এ ছাড়া একই সময়ে জাদুঘরের সামনে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতাবিরোধী আন্দোলন’-এর ব্যানারে ধর্ষণবিরোধী কনসার্টের আয়োজন করা হয়।

পুলিশের বাধায় পণ্ড: রাজশাহী ব্যুরো ও রাবি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রাজশাহীতে পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ পণ্ড করার অভিযোগ উঠেছে। সকালে নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট কিছু শিক্ষার্থী সমাবেশের জন্য জড়ো হলে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ তাদের কর্মসূচি পালন করতে নিষেধ করে।

অন্যদিকে, ধর্ষণ ও নারীর প্রতি যৌন হয়রানির প্রতিবাদে খালি পায়ে পদযাত্রা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ খান ও কয়েক শিক্ষার্থী।

দেশের অন্যান্য স্থানেও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে। খুলনা ব্যুরো জানিয়েছে, দেশব্যাপী ধর্ষণ, শিশু ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে নগরীর দৌলতপুরের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুকৃবি) শিক্ষার্থীরা।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের পৌর শহরের আলফাত স্কয়ারে মানববন্ধন করেছে উদীচী। মাগুরা প্রতিনিধি জানান, ‘জাগ্রত করো বিবেক, কণ্ঠে আনো গর্জন, বন্ধ করো ধর্ষণ’ স্লোগানে মাগুরার চৌরঙ্গী মোড়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছে উদীচী।

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি জানান, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে নিতে কমলনগরে ‘নারী নিপীড়ন ও সন্ত্রাসবিরোধী মঞ্চ’ গঠন করা হয়েছে। পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পিরোজপুর জেলা শাখা।

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, ‘ধর্ষণমুক্ত সমাজ চাই, নিরাপদ জীবন চাই’ স্লোগানে ধর্ষকদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে ফাঁসির দাবিতে কালীগঞ্জে নির্দলীয় ফেসবুক কমিউনিটির ব্যানারে মানববন্ধন হয়।

পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণবিরোধী আইনের দাবিতে পটুয়াখালীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।

পাঠকের মতামত: