কক্সবাজার, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও শিবির ছেড়ে শূন্যরেখায় রোহিঙ্গারা

শরণার্থী শিবিরের নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; তার মধ্যেই কিছু শরণার্থী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখার ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন- এমনটাই বেরিয়ে এসেছে এক জরিপে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে ছয় বছর আগে বাস্তুচ্যুত যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার পথে শূন্যরেখায় আটকা পড়েছিলেন, তারা অনিবন্ধিত।

এছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, শূন্যরেখায় বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সেখানে যাওয়ার অধিকারও কারও নেই।

সেখানকার ক্যাম্পে আটকেপড়া ৬৩০টি পরিবারের প্রায় সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গার তাদের দেখভাল করত আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট কমিটি (আইআরসিআরসি)। এই সংস্থার দেওয়া রেশনেই চলত তাদের জীবন।

সম্প্রতি মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন ‘আরসা ও আরএসও’র সংঘাতের জেরে শূন্যরেখার ক্যাম্প থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা।

জরিপ ও অনুসন্ধান চালিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে, এদের প্রায় দুই হাজারই আগে থেকেই বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধিত ছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তারা শরণার্থী শিবির ছেড়ে শূন্যরেখার ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

কেন তারা ‘মূল স্রোতের’ শরণার্থী শিবিরের জীবন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘তুলনামূলক সামাজিক যোগাযোগহীন ও অধিকতর অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ শূ্ন্যরেখার ক্যাম্পে গিয়ে বসবাস করতেন?

এর উত্তরে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার ৩৩টি অস্থায়ী ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ভিন্ন ভিন্ন কারণের কথা জানিয়েছেন।

মিয়ানমার সীমান্তে ধারাবাহিক সংঘাতের এক পর্যায়ে গত ১৮ জানুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কোনারপাড়া শূন্যরেখা ক্যাম্পে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এবং আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অরগানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত এবং এক শিশুসহ দুই রোহিঙ্গা আহত হন।

ওইদিন পুরো ক্যাম্পটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তখন শুধু জীবন হাতে নিয়ে ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য হন সেখানকার রোহিঙ্গারা। তাদের একটি অংশ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তে এসে আশ্রয় নেয়। সেখানেই খোলা আকাশের নীচে অস্থায়ী শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

এসব রোহিঙ্গার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসন, আরআরআরসি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটি গত রোববার ও সোমবার দুদিনে প্রথমে তাদের গণনার কাজ শেষ করে।

মঙ্গলবার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) জরিপের ফলাফল ঘোষণা করে জানায়, শূন্যরেখা থেকে পালিয়ে তুমব্রুতে আশ্রয় নিয়েছে ৫৫৮টি রোহিঙ্গা পরিবারের ২ হাজার ৯৭০ জন সদস্য। তাদের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে স্থানান্তরের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে টাস্কফোর্স।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি গঠিত হয়
এরই অংশ হিসেবে এসব রোহিঙ্গা আগে থেকে কোনো ক্যাম্পে নিবন্ধিত কি-না সেটাও যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে বুধবার জানানো হয়, এদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা আগে থেকেই কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পের নিবন্ধিত; তারা সেখানে বাসিন্দা হিসেবে ছিলেন। পরে কোনো সময় তারা সেখান থেকে শূন্যরেখায় গিয়েছেন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ অনিবন্ধিত। তারা আগে থেকেই শূন্যরেখার ক্যাম্পে বসবাস করছিলেন।

তাহলে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গা কেন শিবির ছেড়ে সেখানে গিয়েছিলেন- এর জবাবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। দুটি স্থানের ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আলাদা। দুটি জায়গায় দুটি তরফ থেকে রেশন ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকেন রোহিঙ্গারা। তখন ডবল রেশনের লোভেও তারা সেখানে যেতে পারেন।”

“শূন্যরেখায় বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কারও কোনো প্রভাব নেই। অনেক সময় দেখা যায়, এখানে শিবিরে রোহিঙ্গারা অপরাধ করে। তাদের নামে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হয়। সেই মামলা থেকে বাঁচতে তারা সেখানে চলে যায়। ফলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নাগাল পায় না। ফলে অপরাধ করে পার পেতে সেখানে চলে যেতে পারেন। সেটাও হতে পারে।”

নিষেধাজ্ঞার পরেও তারা ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে শূন্যরেখায় কীভাবে গেল- এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর রহমান আরও বলেন, “এখানে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে। তারা সবটুকুই করেন। বিরাট ক্যাম্প। এখানকার নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলে সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেখবে।“

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক সৈয়দ হারুন অর রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্যাম্পের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ জোরদার করা হয়েছে। তারপরও চোরাই পথে হয়তো কেউ কেউ বাইরে চলে যায়। তাদের ধরে আবার ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হয়।“

আগুনে পুড়ছে শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্প
ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গারা কেন শূন্যরেখায় চলে যান- এমন প্রশ্নের জবাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কর্মকর্তা বলেন, “হতে পারে, অনেকের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। সেই পরোয়ানা এড়াতে হয়তো সেখানে চলে গেল। ক্যাম্পের বাইরে তো আমাদের তৎপরতা নেই।”

“শূন্যরেখায় আমাদের প্রশাসন বা বিজিবি, মিয়ানামরের প্রশাসন বা বিজিপির কোনো ভূমিকা নেই। এই সুযোগটি হয়তো অপরাধীরা নেয়। আবার অনেকের সেখানে আত্মীয়-স্বজন আছে। সেখানেও যেতে পারে। নানা কারণই আছে।”

তিনি আরও বলেন, “এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা মামলার আসামি; তারা ক্যাম্পে ফিরলে অবশ্যই আমরা তাদের গ্রেপ্তার করব, আইনের আশ্রয় নেব।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মাদক পাচার, মানবপাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। তারা এসব বাহিনীর আশ্রয়ে শূন্যরেখায় গিয়ে থাকে। কারণ, সেখানে তারা নিরাপদে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। সেখানে তাদের ধরার কেউ নেই।

আরআরআরসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিবন্ধিতদের স্ব স্ব ক্যাম্পেই ফেরত পাঠানো হবে। তাদের যাদের বিরুদ্ধে মামলা ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে দেওয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নিজেরাও এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছে।

আর শনিবারের মধ্যে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজটি শেষ হবে। রোববার থেকে ‘মূল স্রোতের সঙ্গে’ উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে তুলে দেওয়া হবে। নিবন্ধনের আওতায় থাকা রোহিঙ্গাদের আপাতত উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হবে।

শূন্যরেখায় থাকা সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে দুই হাজার ৯৭০ জন রোহিঙ্গার তথ্য পাওয়া গেলেও বাকিরা কোথায়- তা বলতে পারছেন না কেউ।

তবে এ ব্যাপারে প্রশাসন খোঁজ-খবর নিচ্ছে জানিয়ে আরআরআরসি মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এসব রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ মিয়ানমার অভ্যন্তরে চলে গেছে বা বাংলাদেশের কোথাও আত্মগোপন করেছে অথবা বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।”

পাঠকের মতামত: