কক্সবাজার, রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০

পাথর তুমি কার?

পক্ষ হয়েছে কয়েকটি। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো আর ব্যবসায়ী। সবার ওপরে আদালত আর মাঝখানে ঝামেলায় পড়েছে পুলিশ। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া পাথর কোয়ারি থেকে উত্তোলিত শত কোটি টাকার পাথর নিয়ে চলছে কাগজ আর আদেশ টানাটানি। এর মধ্যে টাস্কফোর্সের অভিযানের নামে ভাঙচুর করা হচ্ছে একের পর এক মূল্যবান বলগেট নৌকা। বারবার ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যবসায়িরা বাধ্য হচ্ছেন রাস্তায় নামতে, অন্যদিকে উর্পযুপরি আদেশের বন্যায় পুলিশ পড়েছে ইমেজ সংকটে। উত্তোলিত পাথর জব্দ ও নিলাম করতে মরিয়া জেলা প্রশাসন পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দু’দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি দিয়েও পাথর বিক্রিতে ব্যর্থ। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, শেষ আশ্রয় আদালতের আদেশ তাদের পাথর পরিবহনের পক্ষে থাকলেও পাত্তা দিচ্ছে না প্রশাসন।

লোভাছড়া পাথর কোয়ারির লিজের মেয়াদ শেষ হয় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল। এ কোয়ারি থেকে সড়কপথে পাথর পরিবহনের সুযোগ না থাকায় শুকনো মৌসুমে উত্তোলিত ও স্তূপিকৃত পাথর নৌপথে পরিবহন করা হয় বর্ষা মৌসুমে নদী ভরাট হলে। কিন্তু এ বছর করোনার প্রভাবে শ্রমিক ও নৌকা সংকটে লিজের সময়ের মধ্যে পাথর পরিবহনে ব্যর্থ হয় ব্যবসায়ীরা। নদীর পাড়ে পড়ে থাকে শত কোটি টাকার পাথর। লিজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলিত পাথর পরিবহনে বাধা দিতে শুরু করে প্রশাসন। ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত পাথর পরিবহনে আরও ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন। করোনাকালীন ক্রেতা সংকটে এ সময়ও সমূহ পাথর পরিবহনে ব্যর্থ হলে স্তূপিকৃত পাথর জব্দ ও নিলাম করতে আবারও উঠেপড়ে লাগে প্রশাসন। দিশেহারা ব্যবসায়ীরা আবারও শরণ নেয় আদালতের।

জব্দকৃত অর্ধশত কোটি টাকার পাথর নিয়ে দু’দফায় চলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের নিলাম আহ্বান আর আদালতের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের নিলাম স্থগিত করার প্রচেষ্টা। সর্বশেষ ৬ ব্যবসায়ী ২৮ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করেন। আদালত ভিন্ন ভিন্ন তারিখে প্রতিটি আদেশে ৩০ দিনের মধ্যে লোভছড়া তীর থেকে ব্যবসায়ীদের পাথর অপসারণের নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দাবিকৃত পাথর সংশ্লিষ্টদের সমঝে দিতে বলেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আদালতের আদেশ আমলে নিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর। আদালত যে আদেশ দিয়েছেন তার মধ্যে দুটি আদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। অন্যগুলোও শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ সময়ের মধ্যে যেন পাথর অপসারণ করতে না পারে সে জন্য কোয়ারি এলাকায় গিয়ে বারবার বাধা দেওয়া হচ্ছে। নষ্ট করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি। এটা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের আদালত অবমাননার শামিল।

গত বুধবার দুপুরেও জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযানে অর্ধশতাধিক পাথর বোঝাই নৌকা-বলগেটের ইঞ্জিনের ক্ষতিসাধন করা হলে পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে জড়ো হয়ে মানববন্ধন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বারিউল করিম খানের অপসারণ দাবি করেন। নদীপথে পাথরবাহী নৌকা আটকে দিলে পুলিশের সঙ্গেও বাকবিত-া হয় তাদের।

বৃহস্পতিবার পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসন চত্বরে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করে বিক্ষোভ দেখায় পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পাথর ব্যবসায়ী আবদুল হেকিম শামীম বলেন, আমাদের বৈধ মালিকানা আছে। কিন্তু আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে আমাদের ক্ষতি করে চলেছে প্রশাসন। পুরো পুঁজি খাটিয়ে খরিদ করা পাথর পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধভাবে জব্দ করে রেখেছে।

শুক্রবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে গেলেও তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করেননি।

এদিকে আদেশ প্রতিপালনে প্রশাসন আর ব্যবসায়ীদের মাঝে পড়ে বিব্রত পুলিশ। এ ব্যাপারে কানাইঘাট থানার ওসি মো. শামসুজ্জোহা বলেন, ব্যবসায়ীরা বলছেন তাদের কাছে আদালতের আদেশ আছে, আবার প্রশাসন পাথর পরিবহন বন্ধ করতে বলছে। বারবার এমন ঘটনায় এলাকার সম্প্রীতি কিছুটা তো নষ্ট হচ্ছেই, আমরাও দোটানায় আছি। তবে প্রশাসনের মাধ্যমে প্রাপ্ত আইনি আদেশ প্রতিপালন করাই আমাদের কাজ।

এ ব্যাপারে আলাপে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থানার ওসিকে চিঠি দিয়েছেন অবৈধ পাথর পরিবহন বন্ধ করতে। আবার আদালতের মাধ্যমে পাথরের বৈধ মালিকানা দাবি করে পাথর পরিবহন করতে চাইছে ব্যবসায়ীরা। আমরা কারও বিপক্ষেই যেতে পারছি না। কিন্তু পুলিশের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পাথর পাহারা আর ব্যবসায়ীদের সামাল দিতে গিয়ে আমরা বিব্রত। বিষয়টির দ্রুত সন্তোষজনক এবং আইনানুগ সুরাহা আশা করছি আমরা।

এদিকে উচ্চ আদালত ব্যবসায়ীদের পক্ষে আদেশ দেওয়ার পর খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের উদ্দেশে এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানায়, লোভাছড়া নদীর তীরে জমাকৃত পাথর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক কর্তৃক জব্দ ও নিলামের সিদ্ধান্ত এখতিয়ারবহির্ভূত। গত ১৩ আগস্ট বিএমডির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জাফর উল্লাহ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উচ্চ আদালতের আদেশ অনুসরণ করার কথাও বলা হয়। তারপরও থেমে থাকেনি অভিযান।

এ প্রসঙ্গে সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ এমরান আহমদ বলেন, ‘অনেকে রিট করেছেন ভালো কথা, কিন্তু ব্যবসায়ী পক্ষ আদেশের কোনো কাগজ দেখাননি। সার্টিফায়েড কপিও নয়, একটি সাদা কাগজ দেওয়া হয়েছে। অনেকে জোরপূর্বক পাথর নিয়ে যাচ্ছে। তাই অভিযান হয়েছে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে যথাযথ কাগজই দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী পক্ষের আইনজীবী মঈনুল হক বুলবুল। তার দাবি, ব্যবসায়ীদের বৈধ মালিকানা থাকলেও প্রশাসন ইচ্ছা করে আদালতের বেঁধে দেওয়া সময় নষ্ট করে পাথর জব্দ ও নিলাম করতে চাইছে।

পাঠকের মতামত: