কক্সবাজার, শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১

মিয়ানমারের মানচিত্রে নেই রোহিঙ্গাপল্লী

এইচএম এরশাদ::

মিয়ানমার সরকার এবার তাদের মানচিত্র থেকে রোহিঙ্গাদের বসবাসকৃত ভিটার অস্তিত্বের চিহ্ন মুছে ফেলেছে। রাখাইনে হাজারো গ্রামের বাসিন্দাদের বর্বর নির্যাতন চালিয়ে ঠেলে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশে। প্রায় ১২লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত না নিতে একের পর এক ফন্দি আঁটছে মিয়ানমার সরকার।

সূত্র জানায়, গত তিন বছর তিন মাস ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত একটি পরিবারও ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। এর আগে যারা আশ্রয় নিয়েছিল, তারাও অবস্থান করছে বিভিন্ন শিবিরে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাপে পড়ে হাতেগোনা কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নেয়ার জন্য সন্মতি দিলেও এ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করেনি মিয়ানমার। দেশটির মানচিত্র থেকে রোহিঙ্গাপল্লীর নাম মুছে ফেলা হয়েছে। যেন লাখ লাখ রোহিঙ্গার এলাকা ভিত্তিক ঠিকানা পাওয়া না যায়। যাচাইকল্পে তারা যেই গ্রামের কথা বলবে, ওখানে যাতে তদন্তে ওই গ্রামের অস্তিত্ব না মেলে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের দেশের বাসিন্দা নয় বলে দাবী করতে সহজ হয়।
২০১৭সালের ২৫আগস্ট সকাল থেকে রাখাইনে অসংখ্য রোহিঙ্গাপল্লীতে আগুণ ধরিয়ে দেয় দেশটির সেনা বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে বাংলাদেশে। এরপর দেশটির সেনা বাহিনী ওইসব রোহিঙ্গাপল্লী বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। নিশ্চিহ্ন করে দেয়া ওইসব জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে সরকারি বিভিন্ন দফতরের দালান। কিছু কিছু স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে রাখাইনদের বসতি। রোহিঙ্গা পল্লীগুলো বুলডোজার দ্বারা গুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশে দেয়ার দুই বছর পর কানকিয়াসহ ওইসব রোহিঙ্গাপল্লী দেশটির মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হলো। জাতিসংঘের একটি সূত্র জানায়, গত বছর মিয়ানমার সরকার দেশের নতুন যে মানচিত্র তৈরি করেছে সেখানে কানকিয়াসহ বহু গ্রামের অস্তিত্ব নেই। মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়েছে কানকিয়া গ্রামটির নাম।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমানা চিহ্নিত করণ খাল হচ্ছে নাফ নদী। ওই নদী থেকে আনুমান ৩ থেকে ৬কি.মিটারের মধ্যে রোহিঙ্গা পল্লীগুলোর অবস্থান ছিল। মংডু, বলিবাজার, সাহাববাজার, সিকদারপাড়া, মগ্নিপাড়া, উকিলপাড়া, বুলখালী, হাইচ্যুরাতা, সিকদারপাড়া, কুইরখালী, নাপ্পুরা, চাকমাকাটা, ফকিরপাড়া, রাইমনখালী, কক্ষদইঙ্গা, ঢেকিবনিয়া ও তুমব্রæসহ বহু রোহিঙ্গাপল্লীর বর্তমানে কোন অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশে উখিয়া টেকনাফে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের কেউ যদি তাদের নাভিছেড়া দেশ রাখাইন রাজ্যে (আরাকান) গ্রামের সঠিক নামটি উল্লেখ করে দেশটির বাসিন্দা দাবী করে, তাহলে মিয়ানমার সরকার বলবে ওই নামে কোন গ্রাম রাখাইন রাজ্যের মানচিত্রে নেই।
একাধিক সূত্র জানায়, মিয়ানমারে জাতিসংঘের ‘ম্যাপিং ইউনিট’ ২০২০ সালে দেশটির নতুন ম্যাপ বানিয়েছে। মিয়ানমারের সরকারি মানচিত্রের ভিত্তিতে জাতিসংঘের ‘ম্যাপিং ইউনিট’ নিজেদের ম্যাপ তৈরি করে। জাতিসংঘের অধীনে নানা সংস্থা ওই ম্যাপ ব্যবহার করে। তারা জানান, নতুন মানচিত্রে গুঁড়িয়ে ফেলা গ্রামের নাম আর নেই। বরং ওই জায়গাটিকে এখন কাছের মংডু শহরের বর্ধিত অংশ বলা হচ্ছে। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক দূত ইয়াংহি লি বিদেশী এক গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমার সরকার ইচ্ছা করেই শরণার্থীদের নিজ ভূমিতে ফেরা কঠিন করে দিচ্ছে। তারা কীভাবে সেই জায়গায় ফিরবে, যার কোনো নাম নেই, বা যেখানে তাদের বসবাসের কোনো চিহ্নও নেই? এভাবে সেখান থেকে তাদের শেকড় নির্মূল করে দেয়া হচ্ছে। এ সব কাজের জন্য মিয়ানমার সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে জাতিসংঘ প্রকারন্তরে তাদের এ কাজের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন ইয়াংহি লি।

এদিকে রোহিঙ্গাদের যেমন ওপারে নিয়ে যেতে মিয়ানমার গড়িমসি করছে, তেমনি রোহিঙ্গারাও তাদের দাবী আদায় না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারে ফিরে যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। নিজেদের মিয়ানমারে নির্যাতিত ও অসহায় দাবী করলেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়ার পর তাদের স্পর্দা বেড়ে গেছে। তারা স্থানীয় কাউকে পাত্তাই দিচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ল্যাপটপ, ইন্টারনেট ও দামী মোবাইলে উচ্চ শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকায় ক্যাম্পের প্রায় খবর পৌছে যাচ্ছে বহির্বিশ্বে। ক্যাম্পে এসব সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান থাকায় রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের অভ্যন্তরীনসহ দেশের বহু গোপন তথ্য মুহুর্তে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দফতরে পৌছাচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৫আগস্টের পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে ৮ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। আগে অনুপ্রবেশকারী ও প্রত্যাবাসনে ফাঁকি দিয়ে এদেশে ঘাপটি মেরে থাকা রোহিঙ্গাসহ ১২লাখের বেশী রোহিঙ্গা বর্তমানে অবস্থান করছে টেকনাফ ও উখিয়ায় ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে।

পাঠকের মতামত: