কক্সবাজার, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

মোবাইল অপারেটরদের বহুমাত্রিক প্রতারণা

মোবাইল ফোন অপারেটরদের বহুমাত্রিক প্রতারণা চলছেই। গ্রাহকের অজান্তেই বিভিন্ন ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু করে টাকা লুটে নিচ্ছে তারা। এক্ষেত্রে গ্রাহকের কোনো ধরনের সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া কোনো ধরনের প্যাকেজ চালু করা যাবে না। অথচ মোবাইল অপারেটররা আইন লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ধরনের রিচার্জে ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু রেখেছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বলছে, এ ধরনের কোনো প্যাকেজ যদি কোনো অপারেটর চালু রাখে, সেটা অবশ্যই আইনের লঙ্ঘন। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা ভয়াবহ অন্যায়। গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া কোনো প্যাকেজ চালুর সুযোগ নেই। কিন্তু এভাবে রিচার্জ করে যেসব গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তারা তো অভিযোগ করছেন না। বিটিআরসিতেও এ ধরনের কোনো অভিযোগ জমা হয়নি। তবে ফেসবুকে মাঝেমধ্যে গ্রাহকদের এ ধরনের প্যাকেজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার স্ট্যাটাস দেখা যায়। কোনো গ্রাহক যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেন, অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিভিন্ন পরিমাণে মোবাইল অপারেটরদের স্বয়ংক্রিয় কিছু ইন্টারনেট প্যাকেজ রয়েছে। ঐ পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলেই ইন্টারনেটের ঐ প্যাকেজ চালু হয়ে যায়। অথচ গ্রাহক কোন প্যাকেজ কিনতে টাকা রিচার্জ করলেন, সেটা জানার কোনো ব্যবস্থা নেই।

ব্যাংক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘রবিতে ১৩০ টাকায় এক মাস মেয়াদি ৫ জিবি ইন্টারনেটের একটা অফার আমি পেয়েছি। তখন আমার মোবাইলে দুই টাকা ব্যালান্স ছিল। ফলে আমি ঐ প্যাকেজ কিনতে ১২৮ টাকা রিচার্জ করি। কিন্তু এই রিচার্জের সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে সাকসেসফুল ম্যাসেজ দিয়ে জানানো হয় আমি এক মাস মেয়াদি ৮০০ মেগাবাইট ইন্টারনেট পেয়েছি। অথচ আমি কিনতে চাইলাম কী, আর আমাকে দেওয়া হলো কী? এভাবেই প্রতারণা চলছে।’

জানতে চাইলে রবির হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়েই বিভিন্ন ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু আছে। সেক্ষেত্রে টাকার এমন একটি অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়, গ্রাহক সচরাচর নির্দিষ্ট প্যাকেজ ছাড়া ঐ টাকা রিচার্জ করেন না। এভাবে কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা দুঃখজনক।’ এক্ষেত্রে গ্রাহক আসলেই ঐ প্যাকেজ নিতে চান কি না, সেটা জানতে একটা কনফারমেশন মেসেজ নেওয়া যায় কিনা? জবাবে তিনি বলেন, ‘বেশি এসএমএসে গ্রাহক আবার বিরক্ত হন।’

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম তার গ্রামীণফোনের নম্বরে একটি মেসেজ পান ১৯৯ টাকা রিচার্জে ৩৩০ মিনিট ও ৫০ এসএমএস পাবেন। আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯ টাকা রিচার্জ করি, কিন্তু আমাকে সাকসেসফুল মেসেজ পাঠিয়ে জানানো হয় আপনি ৩১০ মিনিট পেয়েছেন। অর্থাত্, ২০ মিনিট ও ৫০ এসএমএস গায়েব।’

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন মোহাম্মদ হাসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিটিআরসির গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গ্রাহকের সম্মতি নিতে হয়। গ্রামীণফোন বিটিআরসির গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলে।’

একইভাবে পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ তালেবুল ইসলাম তার বাংলালিংক মোবাইল নম্বরে একটি মেসেজ পান ৩১ টাকা রিচার্জে ২ জিবি ইন্টারনেট, মেয়াদ সাত দিন। এরপর তিনি নিজের বিকাশ নম্বর থেকে ৩১ টাকা রিচার্জ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তার কাছে একটি সাকসেসফুল মেসেজ আসে। সেখানে বলা হয়, আপনি ৭২ ঘণ্টার জন্য এক জিবি ইন্টারনেট পেয়েছেন। একইভাবে রফিকুল ইসলাম নামে আরেকজন গ্রাহক জানান, তিনি বারফোন ব্যবহার করেন। সাধারণত মিনিটের বিভিন্ন প্যাকেজ কিনে কথা বলেন। ১০৭ টাকায় বাংলালিংকে ১৭৫ মিনিটের একটা অফার তিনি পান। তখন তার মোবাইলে ব্যালান্স ছিল ৬৬ টাকা। ঐ প্যাকেজটি কেনার জন্য তিনি আরো ৪১ টাকা রিচার্জ করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি সাকসেসফুল মেসেজ পান। সেখানে বলা হয়েছে, চার দিন মেয়াদে তিনি দেড় জিবি ইন্টারনেট পেয়েছেন। অথচ তার বারফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের কোনো সুযোগই নেই। পুরো টাকাটাই গচ্চা গেছে তার।

জানতে চাইলে বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন অ্যান্ড সাসটেইনবিলিটি অঙ্কিত সুরেকা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের নেটওয়ার্কে গ্রাহকদের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের প্যাকেজ চালু হওয়ার সুযোগ নেই। গ্রাহকেরা যে মাধ্যমেই রিচার্জ করেন না কেন, তাদের অনুমতি সাপেক্ষেই প্রাপ্য প্যাকেজ দেওয়া হয়ে থাকে। গ্রাহকেরা সাধারণত একবারে যে পরিমাণ টাকা মোবাইলে রিচার্জ করে থাকেন, তা প্যাকেজগুলোর মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় না। বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে আমরা ৫ অথবা ০ দিয়ে শেষ এমন সংখ্যাগুলোকে মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা থেকে বিরত থাকি। এছাড়া কোনো গ্রাহক ভুলবশত একটি প্যাকেজ চালু করার পর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আমরা প্যাকেজটির মূল্য রিফান্ডের ব্যবস্থা করি।’

রিচার্জেই প্যাকেজ চালু—এই সমস্যায় পড়ে বহু গ্রাহক প্রতিদিন অর্থ খোয়াচ্ছেন। গ্রাহকেরা এটা ভয়াবহ প্রতারণা বলছেন। তাদের মতে, গ্রাহকের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে লুটে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অথচ বিচার চাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) জাকির হোসেন খান বলেন, ‘বিটিআরসিতে কয়েকভাবে অভিযোগ দেওয়া যায়। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক যদি অভিযোগ করেন, অবশ্যই বিটিআরসি ব্যবস্থা নেবে। কারণ গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া কোনো ধরনের প্যাকেজ চালু করা যাবে না, এটা বিটিআরসির নির্দেশনা। কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে অবশ্যই বিটিআরসি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

পাঠকের মতামত: