কক্সবাজার, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪

যে কারণে বিশ্বখ্যাত ৭ই মার্চের ভাষণ

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে ৭ মার্চের ভাষণ ছিলো কাব্যিকতা, শব্দশৈলী, বাক্যবিনাসে ভরপুর। যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’। জুলিয়াস সিজার, উইনস্টন চার্চিল, চার্লস দ্য গল, মার্টিন লুথার কিং, আব্রাহাম লিংকন, অলিভার ক্রমওয়েলের বিখ্যাত সব ভাষণে একইরকম বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণটি ইতিহাসখ্যাত, ভাষণটি ছিল আকারে নাতিদীর্ঘ। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস-এর শব্দ সংখ্যা ২৭২, সময় ছিল ৩ মিনিট।

তথ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সময় ১৮ মিনিট, শব্দ ১১০৮। অপরদিকে মার্টিন লুথার কিং এর ‘I have a dream’ বক্তব্যের সময় ১৭ মিনিট, শব্দ ১৬৬৭। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল মহাকাব্যিক। এই মহাকাব্যের নান্দনিক সৌন্দর্য এবং শব্দের প্রাচুর্য এখনো জনগণকে অনুরণিত করে। যতবারই ভাষণটি কানে আসে, মনে হয় নতুন শুনছি। সেই শৈশব থেকে শুনে আসছি, তাও যেন বারে বারে শুনতে ইচ্ছে করে। একটি বক্তব্য কতটা আবেগময় হতে পারে, হতে পারে মর্মস্পর্শী। তা ৭ মার্চের ভাষণই বলে দেয়।

৭ মার্চ ১৯৭১। ঢাকার রমনার রেসকোর্স ময়দান যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। জনসভায় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু করেন এবং বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে শেষ করেন। ভাষণটির সময়কাল ছিলো ১৮ মিনিট। ১৩টি ভাষায় অনুবাদ করা হয় ভাষণটি। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির কবি হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ৩০ শে অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০০৯ সালের ১২ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ) বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবনা ইউনেসকোতে প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ৭ মার্চের ভাষণটি ইউনেসকোর অপর একটি অনুষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রার’ এ অন্তর্ভুক্তির জন্য অধিকতর উপযোগী বলে প্রতীয়মান হয়। অতঃপর ২০২০ সালের ১৭ জানুয়ারি কোরিয়ান ইউনেসকো জাতীয় কমিশন বিএনসিইউ-কে পত্র মারফত ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অনুষ্ঠিত মেমোরি অফ ওয়ার্ল্ড সম্পর্কিত কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। ১১-১৪ মার্চ, ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিএনসিইউ ৭ মার্চের ভাষণের ওপর প্রস্তুতকৃত খসড়া প্রস্তাব প্রেরণ করে। ২০১৩ সালে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী কর্মশালা। ২০১৬ সালের ৪-১৫ এপ্রিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর ১৯৯তম নিবার্হী বোর্ড সভা চলাকালে তৎকালীন শিক্ষা সচিব এবং শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে পরিমার্জিত প্রস্তাবনাটি ইউনেসকোতে জমাদানের লক্ষ্যে প্যারিসস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেরণ করে। অতঃপর নানা প্রক্রিয়া শেষে ভাষণটি ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেসকো কর্তৃক ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অফ ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রার’-এ বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে গৃহীত হয়। ভাষণটি বর্তমানে তফসিল আকারে বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত (পঞ্চদশ সংশোধনী) হয়েছে।

মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ দফা দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলোঃ ১) চলমান সামনিক আইন প্রত্যহার; ২) সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া; ৩) গণহত্যার তদন্ত করা এবং ; ৪) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

৭ মার্চের ভাষণেই রোপিত হয়েছে স্বাধীনতার বীজ। ওই ভাষণ ঘিরে রচিত হয়েছে নানা কবিতা এবং প্রবন্ধ। তবে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায় নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কি করে আমাদের হলো’ শিরোনামের কবিতাটি। কবিতার শেষ স্তবকটি ছিল এরকম–
শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’

সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের এই দিনে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি যার স্বতঃস্ফূর্ত আহবানে আপামর জনগণ হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছে ‘বাংলাদেশ’।

পাঠকের মতামত: