কক্সবাজার, রোববার, ২২ নভেম্বর ২০২০

রিমান্ড ও তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে ওসি প্রদীপের নানা ছলচাতুরী: লিয়াকতের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি প্রদীপ কুমার দাশকে অবশেষে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। গতকাল বুধবার সকালে কমিটির চার সদস্য কক্সবাজার কারাগারে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বলে নিশ্চিত করেছেন কারা সুপার মোজাম্মেল হোসেন।

কারা সুপার জানান, কমিটির সদস্যরা প্রদীপকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কমিটির সদস্যরা কারাগার থেকে বের হয়ে যান। এ সময় তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ সময় ধরে ওসি প্রদীপের সঙ্গে কথা বলেছি। তার দেওয়া তথ্য এবং আগে পাওয়া তথ্যগুলো বিশ্নেষণ করছি। আশা করছি, সরকারের দেওয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন দিতে পারব।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সিনহা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রদীপ। এ সম্পর্কিত অনেক বিষয় তিনি এড়িয়ে গেছেন। কখনও হত্যার দায় চাপিয়েছেন পরিদর্শক লিয়াকত আলীর ওপর। জিজ্ঞাসাবাদে প্রদীপ তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, লিয়াকতের কাছ থেকে ফোনে খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তিনি দেখেন, সিনহার দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। তখন সিনহাকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দেন। সিনহাকে বিলম্বে হাসপাতালে পাঠানোর জন্যও লিয়াকতের ওপর দোষ চাপান ওসি প্রদীপ।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে অনেক বিষয়ে প্রদীপকে জেরা করেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করা হয় তার কাছ থেকে।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতের দেওয়া তথ্যে অনেক গরমিল রয়েছে। প্রদীপ এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন না বলে দাবি করলেও লিয়াকতের জবানবন্দিতে তার সংশ্নিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার অন্যতম তিন আসামির মধ্যে লিয়াকত ও নন্দ দুলাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও প্রদীপ জবানবন্দি দিতে রাজি হয়নি। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে বহুল আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেন। অন্য আসামিদের দেওয়া অনেক তথ্য সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলেও কৌশলে তা এড়িয়ে গেছেন তিনি।

তিন সাক্ষীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি :এদিকে, সিনহা হত্যার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষী বুধবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ তিন সাক্ষী হলেন টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও মো. আয়াছ।
গতকাল সকাল ১০টার দিকে এ তিনজনকে আদালতে নিয়ে আসেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খাইরুল ইসলাম। বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ তিন সাক্ষী জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর খাস কামরায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত থেকে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার এ তিনজনকে আদালতে হাজির করে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডের প্রথম দিনই তিন আসামি সিনহা হত্যা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এ জন্য তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে আদালতে নিয়ে আসা হয়। স্বীকারোক্তি শেষে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তিনজনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সিনহা। মেজর সিনহা খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশের দায়ের করা মামলার এ তিন সাক্ষীকে ১০ আগস্ট মারিশবুনিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।
সিনহা হত্যার ঘটনায় গত ৫ আগস্ট আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এতে ৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদের বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী এবং এপিবিএনের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। মামলায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩ জনকে।

প্রদীপের বিরুদ্ধে আরও দুটি হত্যা মামলা :মুছা আকবর (৩৫) ও সাহাব উদ্দীন নামের দুই ব্যক্তিকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে এক দিনে আরও দুটি মামলা হয়েছে। বুধবার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল উদ্দীনের আদালতে মামলা দুটি দায়ের করা হয়েছে। নিহত মুছা আকবরের স্ত্রী শাহেনা আকতার ও সাহাব উদ্দীনের বড় ভাই হাফেজ আহামদ বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন।

একটি মামলায় হোয়াইক্যং ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমান, প্রদীপ কুমার দাশসহ ২৭ জনকে আসামি করা হয়। অন্য মামলায় এসআই দীপক বিশ্বাস, ওসি প্রদীপসহ ২৬ জনকে আসামি করা হয়।

মুছা আকবর হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী রিদুয়ান আলী বলেন, মামলার এজাহারটি আমলে নিয়েছেন আদালত। ওই ঘটনা-সংক্রান্ত অন্য মামলা আছে কিনা, তা আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

অন্যদিকে, সাহাব উদ্দীন হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী রিদুয়ান আলী বলেন, এজাহারটি আমলে নিয়ে আদালত এ ঘটনা-সংক্রান্ত অন্য মামলা আছে কিনা, তা আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চন্দনাইশের দুই ভাইকে অপহরণ করে আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি ও পরে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার অভিযোগে ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। নিহত আমানুল হক ফারুক ও আজাদুল হক আজাদের ছোট বোন রিনাত সুলতানা শাহীন গতকাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমীর আদালত মামলাটি গ্রহণ করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এএসপিকে (আনোয়ারা) তদন্ত করে আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আট লাখ টাকা না পেয়ে দুই ভাইকে ক্রসফায়ার মামলার অভিযোগে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই আজাদ ৭ বছর বাহরাইনে ছিলেন। তিনি দেশে আসার পর তার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ লুট করতে তাকে প্রথমে গুম করে, পরে টাকা না পেয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করেন।

প্রদীপ ছাড়াও এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক ইফতেখারুল ইসলাম, কনস্টেবল মাজহারুল, দ্বীন ইসলাম ও আমজাদ। এ ছাড়া স্থানীয় চন্দনাইশ থানার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এই হত্যায় জড়িত বলে দাবি করে তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের আবেদন করেন বাদী।

পাঠকের মতামত: