কক্সবাজার, মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০

রোহিঙ্গাদের জন্য টাকা আছে, ফেরানোর কথা নেই

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৬০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এলেও তাদের একজনকেও গত তিন বছরে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যায়নি৷ আর যে মানবিক সহায়তা আসছে তা-ও প্রয়োজনের তুলনায় কম৷
২০২০ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ১০০ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল৷ কিন্তু তাতে তেমন সাড়া না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সম্মেলন করে৷ সেখানেই ৬০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়৷ এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২০ কোটি ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১১ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং যুক্তরাজ্য ৬ কোটি ডলার দেবে৷ আরো কয়েকটি দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেছেন, ‘‘এই অর্থ সহায়তার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক সংকটে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে জোরালো অবস্থানের প্রতিফলন ঘটিয়েছে৷’’

কিন্তু বাস্তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে৷ আর প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন আর তেমন আলোচনায়ই উঠছে না৷ সম্মেলন শেষে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘‘২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়৷ সেই থেকে আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার৷ বাংলাদেশ হতাশ৷ তাই রোহিঙ্গারা যেন দ্রুত ফেরত যেতে পারে, সে পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে৷’’ আন্তর্জাতিক জোটের নেতা এবং বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সম্ভব ৷ সেটাতেই জোর দিতে হবে৷

অভিবাসন এবং উদ্বাস্তু বিষয়ক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সি আর আবরার মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যে চুক্তি করেছে, তার মধ্যেই দুর্বলতা আছে৷ এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা নেই৷ কোনো সময়সীমা নেই৷ কাকে ফেরত নেবে সেই সিদ্ধান্ত মিয়ানমারই এককভাবে গ্রহণ করবে৷ তৃতীয় পক্ষের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই৷ চুক্তির এই দুর্বলতার সুযোগ মিয়ানমার এখন পুরো মাত্রায় নিচ্ছে৷ বাংলাদেশকে একটা দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের সাথে ডিল করতে হচেছ৷ তিনি বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিল৷ সেখানে যারা অ্যাক্টর তারা তো এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না৷

তার মতে, ‘‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও ভারত বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে৷ কিন্তু আমরা সে ব্যাপারে কার্যকর কিছু করতে পারিনি৷ আমরা বুঝতে পারিনি যে ভূ-রাজনৈতিকভাবে আমরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ৷

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘‘এই সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত হবে৷ কারণ, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তবে তেমন কোনো চাপই সৃষ্টি করেনি৷

বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে মোট ছয় লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা পাঠিয়েছে৷ আর ইউএনএইচসিআর-এর সহয়াতায় মোট আট লাখ ৪০ হাজারের তালিকা করা হয়েছে৷

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশের গত ৩ বছরে অর্থের চাহিদা ছিল ২৩০ কোটি ডলার৷ কিন্তু দাতারা দিয়েছে ১৬০ কোটি ডলার, যা মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ৷ ফলে রোহিঙ্গাদের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৩০৮ কোটি টাকা৷ ভাসানচরে আবাসন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে বাড়তি তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা৷ আবার দাতারা যে অর্থ দেন শতকরা ৩৩ ভাগ পরিচালন ব্যয়েই চলে যায়৷

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুকে তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্বের জায়গায় রাখেনি৷ তাদের বিবেচনায় আরো অনেক বড় বড় সমস্যা আছে৷ ফলে তারা এই ইস্যুটিকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে না৷ আর করোনার কারণে সব দেশই অর্থনৈতিক চাপে আছে৷ ফলে মানবিক সহায়তা কমছে৷ শুরুতে অনেকের আগ্রহ থাকে৷ এখন তারা দেখছে এই সমস্যা চলতেই থাকবে৷ তাই কতদিন আর সহায়তা করবে৷ সমস্যাটি আমাদের ঘাড়ে চেপেছে৷ তাই আমাদের বোঝা তো বইতেই হবে৷ তবে আমাদের উচিত হবে ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঙ্গা রাখা৷

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরাসরি ১৮৩টি এনজিও কাজ করছে৷ বাংলাদেশে মোট নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ১১ লাখ ১৯ হাজার৷ সি আর আবরার মনে করেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়ার যে চেষ্টা বাংলাদেশের, তা প্রত্যাবাসনকে আরো ঝুলিয়ে দেবে, কারণ এখন রোহিঙ্গারা আছে কক্সবাজারের অস্থায়ী ক্যাম্পে৷ ভাসানচরে তো স্থায়ী স্থাপনা, যা এমন ধারণার সৃষ্টি করতে পারে যে তারা তো সেখানেই ভালো আছে৷

পাঠকের মতামত: