কক্সবাজার, সোমবার, ১৬ মে ২০২২

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কী

২০১৭ সালের মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশের কপবাজার সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে ফেরত নেওয়া বা ফিরে যাওয়ার বিষয়টি একটি ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে চলেছে। ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন-সংক্রান্ত বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বিগত প্রায় সাড়ে চার বছরের ব্যবধানে চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেনি। কারণ একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমার ফেরত নেয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর প্রচেষ্টা চালানো হলেও মিয়ানমারের সরকার সব সময় নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। মাঝেমধ্যে যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তখনই কেবল লোক দেখানো কিছু একটা করার চেষ্টা করেছে মিয়ানমার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি এলেও বিগত দিনে চীন বাধা দিয়েছে, সঙ্গে আছে রাশিয়াও। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর যতটা না চাপ প্রয়োগ করছে, তার চেয়ে বেশি বলার চেষ্টা করছে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি। তাদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের মানবাধিকারের বিষয়ে সব সময় বাংলাদেশকে আহ্বান করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ সরকার মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের শুধু আশ্রয় দিয়েছে। তার পরও বাংলাদেশ সরকার ক্যাম্পের নিরাপত্তা, খাদ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ সব ধরনের মানবিক সুবিধাদি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কপবাজারের পাশাপাশি ভাসানচরে স্থাপিত হয়েছে বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে অং সান সুচির মতো নেত্রীর ভূমিকা ছিল সব সময় প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা বিষয়ক মামলার শুনানির সময় তিনি রোহিঙ্গা শব্দটিকে এড়িয়ে চলেছেন। এ ছাড়াও তার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের সব সময় বলার চেষ্টা করা হয়েছে, তারা নাগরিকই নয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ঐতিহাসিক বিষয়কে না এনে বারবারই সামনে আনা হয়েছে বা হচ্ছে ১৯৮২ সালের বার্মার নাগরিকত্ব আইনকে। ২০২১ সালে ১ ফেব্রুয়ারি অং সান সুচিকে গ্রেপ্তার করে জেনারেল মিন অং হ্লাই মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলে নেয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তিত হলেও পরিবর্তন হয়নি রোহিঙ্গাবিষয়ক নীতিতে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য সময়ক্ষেপণের নানা কৌশল নিয়েছে বারবার। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে সাত ভাগে বিভক্ত করে তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে নিজেদের দেশে ফেরত নেওয়ার কথা বললেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ে চীনের মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হয়। এ বৈঠকের পরও দেখা যায়, যা বলার চীনের পক্ষ থেকে বলা হলেও মিয়ানমার ছিল বরাবরই নীরব।

২০২২ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে চীনা দূতাবাস আয়োজিত ‘স্প্রিং ডায়ালগ উইথ চায়না’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চলতি বছর বড় কিছু হবে।’ বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের আশা নতুন কিছু নয়। অপরপক্ষে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তালিকা প্রণয়ন, প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ, নাগরিকত্বের প্রমাণসহ নানাবিধ নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে চলেছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন করতে সব প্রস্তুতি নিলেও দু-দু’বার সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করাটাও ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে। চোরাচালান, খুন, রাহাজানি, অপহরণ, মানব পাচারসহ সন্ত্রাসী ও সমাজবিরোধী চক্রের নানা নেটওয়ার্ক ক্যাম্পগুলোর দৃশ্যমানের বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ২০২১ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৪৭তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের মার্চে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ে ততটা সরব হতে দেখা যায়নি বিগত দিনে। এমনকি ভারত, জাপান, চীনের পক্ষ থেকেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কার্যত মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো দৃশ্যত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক মহলে নীরবতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ের সমাধান নিয়ে ছিল বরাবরই উদাসীন। রোহিঙ্গাদের ফেরতের বিষয়ের প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ২০২২ সালে রোহিঙ্গাদের একটা তালিকা বাংলাদেশের কাছে পাঠায় মিয়ানমার। ১১ হাজার জনের একটা তালিকা পাঠানোর কথা থাকলেও তালিকায় স্থান দেয় মাত্র সাতশজনের। তবে সেখানে রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। তালিকায় এক পরিবারের বাবা থাকলেও তালিকায় নেই তার বউ কিংবা তার ছেলেমেয়ে। এটাও মিয়ানমারের একটা নতুন কৌশল। যতই দিন যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন কৌশলের মাত্রা যুক্ত হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে। কবে নাগাদ রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদের মাটিতে ফেরত যাবে, এই প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের ভবিষ্যৎ! সূত্র: সমকাল

পাঠকের মতামত: