কক্সবাজার, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

বিশ্লেষকদের অভিমত

রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ভাসানচরে নেওয়া জরুরি

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে সংঘাত ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছে সরকার। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও বলছেন, রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ ও আধিপত্যের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই সংকট সমাধানে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো উচিত। এখনই মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব না হলে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্লেষকদের যুক্তি, ভাসানচরের আধুনিক উন্নত পরিবেশে সাধারণ রোহিঙ্গারা নিরাপদে থাকতে পারবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তার উদ্বেগটা কমবে।

মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে নিজ আগ্রহ থেকেই ভাসানচর পরিদর্শন করে এসেছি। সঙ্গে কয়েকজন বিদেশিও ছিলেন। ভাসানচরে অত্যন্ত আধুনিক ও নিরাপদ বসবাসের উপযোগী পরিবেশ দেখেছি। সেখানে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তর সম্ভব। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা উচিত।’

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ভাসানচরে সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে একাধিক সুবিধাভোগী পক্ষ থেকে বাধা এসেছে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাস্প ঘিরে এই সুবিধাভোগী গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একদল সুবিধাভোগী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাধ্যমে মাদকের কারবার, অস্ত্র চোরাচালান, নারী পাচারের মতো কর্মকাণ্ড করছে। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সুবিধাভোগী আরেকটি অংশ হচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা থেকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবা দেওয়ার জন্য কর্মরতরা। তারা আসলে কাজ করছে নিজেদের সুবিধার জন্য। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা কিছু সহায়তা পাচ্ছে। এই সুবিধাভোগী অংশ কক্সবাজারে ফাইভ স্টার হোটেল, বিনোদনসহ যে সুবিধা পায়, সেটা ভাসানচরে পাবে না বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা করছে।

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে নিলেই সংকটের সমাধান হবে না। সংকটের প্রকৃত সমাধান রোহিঙ্গাদের নিজে দেশে ফেরত নেওয়া। তবে ভাসানচরে রোাহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য উন্নত ও আধুনিক সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গাদের যতজনকে সম্ভব সেখানে স্থানান্তর যুক্তিযুক্ত।

আবদুর রশীদ বলেন, সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে হানাহানি ও সহিংসতা চলছে তার পেছনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মদদ থাকতে পারে। নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গাসংকট ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতাদের একটি অংশকে ব্যবহার করে সংঘাত-সহিংসতার কাজটি করতে পারে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। এটি একপর্যায়ে নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমন আশঙ্কার কথা আমি আগে থেকেই বলে আসছি। রোহিঙ্গা ক্যাম্প প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণে নেই। সেখানে নানা ধরনের গুরুতর অপরাধ ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ধারাবাহিকভাবেই ঘটছে। এটা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের একটা অংশকে ভাসানচরে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যারা নিয়মিত আয়ের পথ তৈরি করেছে তারা কখনোই এই স্থানান্তর চাইবে না। এ কারণে সরকারকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গারা সেখান থেকে খুব সহজেই নাফ নদের ওপারে তাদের দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। ভাসানচরে গেলে এই যোগাযোগ কঠিন হয়ে যাবে—এমন ভাবনা উসকে দিয়ে কিছু মানুষ রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। এখন সরকারকে কঠোর হতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করতে হবে। কোনো একটি গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নিতে পারে না। কালেরকন্ঠ

পাঠকের মতামত: