কক্সবাজার, শুক্রবার, ২০ নভেম্বর ২০২০

রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ বলছে না ভারত

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হচ্ছে সবখানেই সহযোগিতা চাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশকে সবচেয়ে হতাশ করেছে ভারতের ভূমিকা। ভারত প্রায় সব আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছ থেকে সমর্থন লাভ করলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন দিল্লির কাছ থেকে হতাশাজনক সাড়া পেয়েছে ঢাকা। এমনকি এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভারতের ভূমিকা এখন ‘রহস্যজনক’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একদিকে তারা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের স্ট্যাটাস নিয়েও তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ভারত রোহিঙ্গাদের স্ট্যাটাস নিয়ে এখন প্রায় মিয়ানমারে সুরে কথা বলছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা গত ১৮-১৯ আগস্ট ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতা চায়। দেখলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠক নিয়ে ২০ আগস্ট একটি প্রেস রিলিজ জারি করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ভারতকে এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে ইউএনএসসির সদস্য হিসেবে তার কাছ থেকে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছে।

বাংলাদেশ আশা করছে যে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে এসব শরণার্থীকে মিয়ানমারে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত আরও অর্থবহ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে, তার ক’দিন পর পররাষ্ট্র সচিবের সফর নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিবৃতিতে ভারত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি)’ বলে অভিহিত করেছে। এই শব্দটি শরণার্থীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বস্তুত এটি মিয়ানমার যে দাবি করে আসছে, তার বাংলাভাষী এসব নাগরিক বাংলাদেশি- তার সঙ্গে সুর মেলানো। ভারত ২৬ আগস্ট জারিকৃত তার বিবৃতিতে বলেছে, ‘The issue of safe repatriation of internally displaced persons from the Rakhine state also came up for discussion.’ মানে, ‘রাখাইন রাজ্য থেকে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আলোচনার জন্য উঠেছিল।’ এই আলোচনা বলতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৮ আগস্ট যে বৈঠক করেছেন সেটাকে রেফারেন্স হিসেবে দিয়েছে।

খেয়াল করেন, মিয়ানমারের মতো ভারত ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করছে না। সংজ্ঞা অনুসারে, আইডিপি হচ্ছে, এমন একজন মানুষ যিনি নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন তবে সুরক্ষা পেতে দেশের সীমানা অতিক্রম করেননি। শরণার্থী থেকে এটা ভিন্ন, তারা নিজ দেশের পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ভারত যদি তাদের আইডিপি মনে করে তবে কি কক্সবাজার মিয়ানমারের অংশ নাকি আকিয়াব বাংলাদেশের অংশ। দুঃখজনক হচ্ছে, বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতের এই বিবৃতির প্রতিবাদ করা হয়েছে- এমন কোনও সংবাদ আমি দেখিনি।

মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সবকিছুই এখন ভেস্তে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসেবে যেমন বেঁচে থাকার অধিকার আছে তেমনি বাংলাদেশের পক্ষেও কতদিন সম্ভব এভাবে আর একটি দেশের বিপুল একটি সংখ্যাকে আশ্রয় দেওয়া! কক্সবাজারের পরিবেশ বিপর্যয় এমন হয়েছে, বন্যহাতি পর্যন্ত বন পাচ্ছে না থাকার জন্য। জনপদে এসে মানুষের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বন উজাড় করে দিচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। দেশিরাও আছে সে কাজে।

ভারত, চীন, রাশিয়ার সহমতের ও সমর্থনের কারণে মিয়ানমার একটা সুরক্ষিত অবস্থানে বসে রোহিঙ্গা হত্যা ও বিতাড়নের কাজ চালিয়েছে। তবে এ তিন রাষ্ট্র ছাড়া সম্পূর্ণ বিশ্বজনমত ও বিভিন্ন শক্তি রোহিঙ্গাদের পক্ষে। বাংলাদেশ তাদের সরব করতে পারেনি সমস্যাটার স্থায়ী সমাধানের ক্ষেত্রে।

১৯৯০ সালে সার্বরা কসোভোর মানুষকে আলবেনিয়ার মানুষ বলে যখন নির্বিচারে হত্যা করেছিল তখন মনে করেছিলাম কসোভোর মানুষকে উদ্ধার করার বুঝি কেউ নেই। ইউরোপ তো ‘আর্কাইভ অব সিভিলাইজেশন’, তারা এত নির্মমতা সহ্য করে কীভাবে! ন্যাটো বাহিনী ৭৮ দিন যুগোস্লোভিয়ার বিভিন্ন অংশে বোমাবর্ষণ করেছিল; শেষ পর্যন্ত সবই মীমাংসা হয়েছে আর হত্যাকারীরা ও যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয়েছিল। এখনও দেখছি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কথা বলছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন মিয়ানমার যুদ্ধাপরাধী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছে যে তারা রাখাইনে মানবতার বিপর্যয় রোধ করতে চায়।

রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ভারত ছাড়া ভরসা করছিল চীনের ওপর। কিন্তু এই দুটি দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ আশানুরূপ সহযোগিতা তো পায়নি-ই; বরং ওই দুই দেশ আরও বেশি করে মিয়ানমারের সঙ্গে এমনভাবে অর্থনীতি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে যে, তারা বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের স্বার্থকেই বেশি করে দেখছে।

ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারাও ভারতে আশ্রয় নেওয়া ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করে দেবে। কিছু রোহিঙ্গাকে তারা বাংলাদেশে পাঠিয়েছেও। চীনেও নাকি ১০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ, ভারতে, চীন, মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে জীবন রক্ষার জন্য। তারা ভারত আর চীনের ভূ-রাজনীতির বলি হয়েছে। ভারত আরাকানের সঙ্গে রাস্তার কাজ করছে আর চীন আরাকানে বন্দর বানিয়েছে। আর চীন পর্যন্ত পাইপলাইন বসাচ্ছে।

সাম্প্রতিককালে চীন-ভারত পরস্পরের সঙ্গে যেভাবে সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে মুখোমুখি হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের এই সমস্যা নিয়ে তাদের মাথা ঘামানোর সময় হবে কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুই দেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক এই ঝামেলাতে বাংলাদেশকে জড়াতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য আরও ভয়াবহ এবং সমস্যার সমাধান আরও বেশি অনিশ্চয়তায় পড়তে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।

এদিকে, মিয়ানমারে সরকারি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের তিন বছর পূর্ণ হয়ে এখন চার বছর চলছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী মাসজুড়ে উত্তর রাখাইনের মংডু, রাথেদং, বুড়িচং, এবং আকিয়াবে বসবাসরত সাধারণ রোহিঙ্গারা নির্মম নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশু বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ১৯৯১-৯২ সালেও এমন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ, তাদের মধ্যে ৩২ হাজারকে মিয়ানমার এখনও ফেরত নেয়নি। দুই দফায় আসা রোহিঙ্গারা সব মিলিয়ে এখন প্রায় ১২ লাখ।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। গত ৩ বছরে ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিয়েছে ৯০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু। আর সন্তানসম্ভবা আরও ৩০ হাজারের অধিক নারী। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি মানতেই রাজি না রোহিঙ্গা নারীরা। তবে প্রশাসনের দাবি, জন্ম নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পে নানা কার্যক্রম চলমান।

দিন যতই যাচ্ছে সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে সরকারের উচিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা।

 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

পাঠকের মতামত: