কক্সবাজার, রোববার, ২৮ নভেম্বর ২০২১

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্রের ঝনঝনানি, বেড়েছে গোয়েন্দা নজরদারি

আবদুর রহমান, টেকনাফ::

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য চায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। তাই রাতের আঁধারে অস্ত্র হাতে মহড়া চলে নিয়মিত। এমনকি ক্যাম্পের পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা রয়েছে বলেও একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। অস্ত্রের কারখানা আছে সন্দেহে একটি ক্যাম্প নজরদারিতেও রেখেছেন গোয়েন্দারা।

র‌্যাব বলছে, গত বছরের ৫ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার খোঁজ পায় তারা। সেখান থেকে দুই অস্ত্র কারিগরকে গ্রেফতারও করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে ৩টি দেশি অস্ত্র, ২ রাউন্ড গুলি ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। আটক দুজন কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার (৫০) ও এখলাস (৩২)।

জানতে চাইলে র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নিত্যানন্দ দাস জানান, ‘সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্যের খবরে ক্যাম্পে অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। দ্রুত অভিযান চালানো হবে।’

তিনি আরও জানান, ‘রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় মাদক আর অস্ত্র একই সূত্রেই গাঁথা। এটি একটি সিন্ডিকেট। মূল হোতাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

প্রসঙ্গত, উখিয়ার কুতুপালং মেগাক্যাম্পের লম্বাশিয়া শিবিরের এআরএসপিএইচ কার্যালয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর মুহিবুল্লাহকে এবং বালুখালীর দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামিয়াহ মাদ্রাসায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ক্যাম্পজুড়ে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর নেপথ্যে নিহতের স্বজনরা রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠন আরসাকে দায়ী করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের আরসার অস্তিত্ব নেই।

এদিকে শুক্রবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুহিবুল্লাহ ও ছয়জন নিহতের ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। এসময় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. রফিকুল ইসলাম, ৮ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন, রবিউল ইসলাম ও উখিয়া-টেকনাফ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাকিল আহমেদ। এসময় কর্মকর্তাদের ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন র‌্যাবের ডিজি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এসময় ক্যাম্পের অস্ত্রধারীদের বিষয়ে আলোচন উঠে আসে এবং তাদের গ্রেফতারের অভিযান জোরদারের কথা উল্লেখ করেন র‌্যাবের মহাপরিচালক।

এপিবিএন বলছে, গত সেপ্টেম্বরে এপিবিএন পুলিশ সদস্যরা উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পসহ পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪৭টি দেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এসময় ৮০ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে গোলাবারুদ, মামলা হয়েছে ৫৭টি।

৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানান, ‘মুহিবুল্লাহ হত্যার পর ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ৩৯টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী সবাইকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

র‌্যাবের দেওয়া তথ্যমতে, সীমান্ত ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় চার বছরে (২০১৯ থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত) প্রায় ১৯০টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় গোলাবারুদ পাওয়া গেছে ছয় শতাধিক।

জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় অস্ত্র মামলা হয়েছে ১৭টি। ২০২০ সালে হয়েছে ২৭টি। চলতি বছরের ১০ মাসে অস্ত্র মামলা হয়েছে ২৫টি। এ সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১৭টি দেশি পিস্তল, ৫৫টি এলজি, ৪টি বিদেশি পিস্তল, ৪০টি একনলা বন্দুক, ৩০টি দেশি বন্দুক, ৭টি পাইপগানসহ বেশক’টি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘ক্যাম্পগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অস্ত্রধারীদের ধরতে অভিযান চলছে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য-সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মহড়ায় পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ক্যাম্পসহ গোটা জেলার মানুষই আতঙ্কে আছে।’

পাঠকের মতামত: