কক্সবাজার, শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১

রোহিঙ্গা প্রত‌্যাবাসন নিয়ে জটিলতার শঙ্কা, তবে…

মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা সেনাবাহিনী দখল করায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কূটনীতিকরা। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনাশাসকদের সঙ্গে আলোচনা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, প্রত্যাবাসন-প্রক্রিয়া নিয়ে চলমান আলোচনায় কিছুটা ছন্দপতন হলেও প্রক্রিয়া শুরুর আশা দেখছে বাংলাদেশ।

সোমবার (১ ফেব্রুয়ারি) রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারর সেনাবাহিনী। এর আগে তারা মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) শীর্ষ নেতাদের আটক করে।

এদিকে, মিয়ানমারে সেনাশাসন জারি হওয়ার পর ঢাকা থেকে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করে ও প্রচার করে। বাংলাদেশ প্রত্যাশা করে, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা বহাল থাকবে। কাছের ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে আমরা মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দেখতে চায় ঢাকা। মিয়ানমারের সঙ্গে পারস্পরিক কার্যকরী সম্পর্কের বিকাশে অবিচল থেকেছি। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, এই প্রক্রিয়াগুলো অব্যাহত থাকবে।’

তবে, সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আলোচনার অগ্রগতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সমস্যাটি দেশটির সেনাবাহিনীর তৈরি। এখন তারা ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, তারা খুব সহজে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রাজি হবে না। তাই দেশটির ক্ষমতায় যেই থাকুক, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমেনা মোহসিন বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহল সম্পৃক্ত থাকায় তাদের থেকে একটি চাপ থাকবে ওই দেশের সেনাবাহিনীর ওপর। বাংলাদেশের উচিত হবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া।’

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘মিয়ানমারে এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুর গুরুত্ব কিছুটা কম থাকবে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই এখন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সামলানোর প্রতি তাদের মনোযোগ থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমাদের চুক্তি মিয়ানমারের সরকারের সঙ্গে। আমি মনে করি, সাময়িক অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও আলোচনার দরোজা খোলা রয়েছে।’

মিয়ানমারে সামরিক শাসন জারি হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা অব‌্যাহত থাকবে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসন ইস্যুতে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে নয়। এর আগেও এই সেনা সরকারের অধীনেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। কাজেই এই প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটা কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে গেলেও আটকে যাবে না বলে মনে করছি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নিলে অশান্তির আশঙ্কা আছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি ত্রি-পক্ষীয় বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে, প্রত্যাবাসন কী প্রক্রিয়ায় শুরু করা যায়, সে পদ্ধতিগত আলোচনাও হয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন তাদের ইতিবাচক মনোভাব।’

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গত তিন বছর ধরে দফায় দফায় বৈঠক হলেও করোনা পরিস্থিতি, সাধারণ নির্বাচনসহ আরও নানা কারণ দেখিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া হয়। এই পর্যন্ত দুই বার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ হলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। সবশেষ গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও চীনের সাথে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ত্রিদেশীয় বৈঠকে বসে। সেখানে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব তুলে ধরে। এসব প্রস্তাবে সব পক্ষই মোটামুটি সম্মত হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দুই দেশের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু এর মধ্যে দেশটিতে সেনা অভ্যুত্থানের ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পাঠকের মতামত: