কক্সবাজার, শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০

যুক্তরাষ্ট্র

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এগিয়ে আসুন বাইডেন

আমেরিকার নির্বাচনের দিকে পুরো বিশ্বের আগ্রহ থাকে। তবে এবার অনেকটা স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হবে নাকি আবার চার বছরের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তা নিয়ে সবার মধ্যে চিন্তাভাবনা ছিল। এমনকি আমরা দেখেছি ইউরোপ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল নিয়োগ করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য। কারণ নির্বাচনের আগে সুষ্ঠু ভোট হবে কিনা- এ নিয়ে আলোচনা যেহেতু হয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাধ্য হয়েছিল নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে। এই মনোযোগের একটি বড় কারণ হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প গত চার বছরে আমেরিকাকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন তা বিশ্বজুড়েই একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। আমরা দেখেছি ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন ধরনের বিভাজনের রাজনীতির মাধ্যমে তার সমর্থন বাড়াচ্ছিলেন। এর মধ্যে সংখ্যালঘু বিরোধী, অভিবাসী বিরোধী, ইসলাম বিরোধী, ইউরোপ বিরোধী এবং চায়না বিরোধী- সব মিলিয়ে এটাই তার হলমার্ক্স হয়ে গিয়েছিল। অ্যারোগেনস অব পাওয়ার বড় আকারে দেখা যাচ্ছিল। বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে তিনি হ্যান্ডশেক না করা, বিভিন্ন নেতা ও সাংবাদিকদের কটূক্তি করা, ভুয়া তথ্য সরবরাহ করার মতো বিষয়গুলো আমেরিকার নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। সেই জায়গায় উদ্বেগ ছিল আবার চার বছরের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসেন কিনা। জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিস নির্বাচিত হওয়ার ফলে একধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস পৃথিবী নিয়েছে। বিশেষ করে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের রাজনৈতিক তৎপরতায় এটা ধারণা করা যায় যে, তারা উভয়ই আমেরিকায় গণতন্ত্রের যে কাঠামো তৈরি হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস রাখবেন, রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখবেন এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাদের ইতিবাচক সম্পর্ক থাকবে।

করোনা মহামারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহামারি মোকাবিলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর ছিল না। অনেক সময় তিনি এ বিষয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। ট্রাম্পের চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ বেড়েছে। তিনি বর্ণবাদকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, তাতে অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করা শুরু করেছে। আবার অনেকেই তাকে হিটলারের চেয়েও ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব ব্যবস্থার যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, সেগুলোও ভেঙে যাচ্ছিল। মহামারিকে কেন্দ্র করেই ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বের হয়ে যান; যা বিশ্বে আতঙ্কের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু থেকেও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। শেষের দিকে এসে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার অভিবাসী শিশুদের যেভাবে মেক্সিকোর দিকে ঠেলে দেন, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ট্রাম্প সরকার চালাচ্ছিলেন টুইটারের মাধ্যমে।

যদিও সবাই জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিসকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন; আমরা যখন এ বিষয়ে কথা বলছি, তখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মেনে নেননি। ভয়ের বিষয় হলো, তিনি আদৌ এ ফলাফল মেনে নেবেন কিনা! তিনি এখনও তার সমর্থকদের বলছেন এগুলো ভুয়া খবর।

আমরা যদি ভোটের সংখ্যা দেখি তাহলে দেখা যাবে জো বাইডেন পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ বেশি ভোট পেয়েছেন। এটা যেমন সত্য, তেমনি পরাজিত ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন সেটাও কিন্তু ঐতিহাসিক। সেটিও বড় চিন্তার বিষয়। কারণ এ ধরনের নেতিবাচক একজন ব্যক্তি ও তার দল এত পরিমাণ ভোট পাবে তা কেউ চিন্তা করেনি। আমরা নির্বাচনের পরপরই দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ-হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার গণতন্ত্র নিয়ে যে সংশয় তা এখনও কাটেনি।

এবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। সেখানে কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন এমন ভোটার সংখ্যা পাঁচ মিলিয়নের ওপরে। সাধারণত এই ভোটাররা ভোট দিতে আসেন না, কিন্তু এ নির্বাচনে তারা ভোট দিয়েছেন। মূলত তাদের উপস্থিতিই জো বাইডেনের জয়কে সহজ করেছে। ডেমোক্রেটিক দলের নেতাদের এ বিষয়টি চিন্তা করা উচিত যে, নতুন সরকার গঠন বা গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে এই ইনডিপেনডেন্ট ভোটাররা কতটা প্রভাব রাখতে পারেন।

বাইডেনের ক্ষমতায় আসা আমাদের জন্য কী বার্তা নিয়ে আসছে? আমরা আশা করব ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিকভাবে বিভাজনের যে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, জো বাইডেন সেখান থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং সবার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবেন। তিনি হয়তো দ্রুত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় একীভূত হবেন। বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেবেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জো বাইডেনের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এক. মহামারি মোকাবিলা করা; দুই. বিভাজনের রাজনীতি দূর করা। এ দুটি কাজ করতেই হয়তো তার নির্ধারিত মেয়াদের একটি বড় অংশ চলে যাবে। মহামারি মোকাবিলার সঙ্গে ভ্যাকসিন ও গ্লোবাল কো-অপারেশন জড়িত। সবকিছু ঠিকমতো হলে ভ্যাক্সিন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো বেশি লাভবান হবে।

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। এটা যতটা না যুক্তরাষ্ট্রের কারণে বেড়েছে তার চেয়ে বেড়েছে বাংলাদেশের কারণে। বাংলাদেশ তার কাঠামো মজবুত তার একটা বড় কারণ হলো বাংলাদেশ মহামারিকে মোটামুটিভাবে সামাল দিয়েছে। আমরা বিভিন্ন সূচকে সম্মানজনক অবস্থানে আছি। যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই আগ্রহ দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও চীন, জাপান ও ভারতের আগ্রহ বেড়েছে বাংলাদেশে। এই আগ্রহ বাড়ার কারণ কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জো বাইডেন নয়, বরং আমরা আমাদের কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি বলেই তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই কাঠামোকে যদি আরও শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে আগ্রহ আরও বাড়বে। এখানে কিছু বিষয়ে কাজ করার আছে। দুর্নীতি রোধ, মানবাধিকার সমুন্নত করার মতো কাজগুলো ঠিকমতো করা গেলে আগ্রহ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়ার একটি কারণ আমরা লক্ষ্য করছি যে, আগে চিন্তা করা হতো ভারতের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করা, অনেকটা ভারতকে দায়িত্ব দেওয়ার মতো। কিন্তু দেখা গেছে ভারত এক্ষেত্রে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। এখন ভারতের সঙ্গে শুধু পাকিস্তানের বৈরিতা নয়, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও আমরা দেখি বিভিন্ন সময় বিজেপির নীতিনির্ধারকরা মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলেছেন, বিশেষ করে এনআরসি, সিএএ নিয়ে সেগুলো দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মহামারি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিজেপি সরকার সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ ছাড়া নানা কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে বেশি উৎসাহী যুক্তরাষ্ট্র। এর একটা বড় কারণ হতে পারে যেহেতু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টি।

জো বাইডেনের কাছে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় দেখতে চাইব। সমকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা। আমরা তিন বছর থেকে দেখাশোনা করছি। রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বড় কারণ হলো মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর চালানো গণহত্যা। গণহত্যার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই জায়গায় আমরা বাইডেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করব যেন মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। অবশ্য জো বাইডেন ইতোপূর্বেই রোহিঙ্গাদের পক্ষে তার অবস্থান পরিস্কার করেছেন। এমনকি আসাম ও কাশ্মীরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশ্যে তিরস্কার করেছেন। কোনো সন্দেহ নেই কভিড মোকাবিলা, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, বাণিজ্য সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো আমাদের দিক থেকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশ ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এ নীতির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিশীল। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাঠামো থেকে জো বাইডেন সরে দাঁড়াবেন। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু কেবল যুক্তরাষ্ট্রেরই শত্রু, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বাংলাদেশের শত্রু নয়। কার সঙ্গে কার সম্পর্ক এ ব্যাপারে আমরা হস্তক্ষেপ করব না। গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিশ্ব ব্যবস্থার কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেই জায়গায় বাইডেন যদি মনে করে আমেরিকাই সেরা, আমেরিকা সব করবে, তাহলে কিন্তু ট্রাম্পের ভূত থেকেই যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় হয়তো তিনি যুক্ত হবেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরবেন; কিন্তু চীন প্রসঙ্গে কী করবেন সেটি এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তিনি অর্থনীতির দিক দেখবেন। তিনি যদি মনে করেন চীন নিয়ে ট্রাম্পের নীতির ফলে আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, তাহলে হয়তো ট্রাম্পের নীতিই অনুসরণ করবেন। আর ক্ষতি বেশি হয়ে থাকলে বা লাভ করার বেশি সুযোগ থাকলে হয়তো নতুন পলিসি দেখা যাবে।

আমরা জানি, বাইডেন বয়সের কারণে এক মেয়াদেই প্রেসিডেন্ট থাকছেন। কাজেই আমরা প্রত্যাশা করতে পারি তার চেষ্টা থাকবে এমন কিছু করার যাতে বিশ্বের সবাই তাকে মনে রাখবে যখন তিনি থাকবেন না।

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠকের মতামত: