কক্সবাজার, শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১

সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করতে হবে

আরিফুল ইসলাম::

অপার সৌন্দর্যঘেরা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। কিন্তু নানাবিধ কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপটি এখন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে এর নৈসর্গিক রূপ। বৈচিত্র্যময় সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির দ্বারপ্রান্তে। সেন্টমার্টিনের এমন পরিবেশগত বিপর্যের কারণ হিসেবে মূলত মানুষই বিশেষভাবে দায়ী। সেন্টমার্টিন উপভোগ করতে কার না ভালো লাগে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯-১০ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিনে অবস্থান করে। কিন্তু ভ্রমণপিয়াসি এসব মানুষের পরিবেশবিরোধী আচরণের ফলে এর পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা মেলে গাংচিল পাখির। গাংচিল পাখির এমন অবয়ব দৃশ্য দেখে পর্যটকরা জাহাজ থেকে তাদের চিপস, বিস্কুট ইত্যাদি খেতে দেয়। নিষিদ্ধ হলেও কে শোনে কার কথা। পর্যটকদের দেওয়া এসব খাদ্য পাখির জীবনকে মরণাপন্ন করে তুলছে, নাফ নদীতে কমেছে গাংচিল পাখির সংখ্যা। এ ছাড়া ভ্রমণের সময় পর্যটকরা চিপস, বিস্কুটের প্যাকেটসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্য জাহাজ থেকে সাগরে ফেলছে। ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সামুদ্রিক বিভিন্ন জলজ ও উদ্ভিজ্জ প্রাণীরা। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।

পরিসংখ্যান বলছে, সমুদ্রের পানিতে ৫ ট্রিলিয়নের বেশি প্লাস্টিক ভেসে থাকে। ১৪ মিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক প্রতি বছর সমুদ্রে জমা হচ্ছে। সমুদ্রে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। খাদ্য হিসেবে ভুল করে প্লাস্টিক খাওয়ার ফলে প্রতিনিয়ত সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে সেন্টমার্টিন হচ্ছে দূষণ। এ দ্বীপে বাড়তি পর্যটক ভিড় করায় গাছপালা কেটে, প্রবাল ভেঙে, সমুদ্রসৈকতের বালু তোলাসহ পরিবেশের ক্ষতি করে নির্মাণ করা হচ্ছে অবৈধ কটেজ, হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট। ব্যবসায়িক মনোভাব দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। দ্বীপে সুপেয় ভূগর্ভস্থ পানি সীমিত। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সেন্টমার্টিন স্তরের মিষ্টি পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ থেকে সুপেয়পানি উত্তোলনের ফলে এ দ্বীপের নলকূপগুলোতে লবণাক্ত পানি চলে আসছে। যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া অবৈধ হোটেল-মোটেলগুলোর খোলা পায়খানা নির্মাণসহ নানা পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ডের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। সেন্টমার্টিন দ্বীপে শৈবাল, প্রবাল, কচ্ছপ, লাল কাঁকড়া, ঝিনুকসহ নানা জলজ ও উভয়চর প্রাণী এবং পাখিসহ নানা জীববৈচিত্র্য রয়েছে। ক্রমাগত দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক প্রবাল। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রবাল শূন্য হয়ে পড়ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৮ বছরে দ্বীপটিতে প্রবাল আচ্ছাদন ১ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে শূন্য দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। প্রবাল প্রজাতি ১৪১টি থেকে কমে ৪০টিতে নেমেছে। বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা সাড়ে ৪ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে নেমেছে ৩ বর্গকিলোমিটারে। এসব সামুদ্রিক প্রবাল, শৈবাল রক্ষায় নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ। এ ছাড়া সমুদ্রে ডলফিন মৃত্যুর খবর নতুন কিছু নয়। প্রায়ই জেলদের জালে ধরা পড়ে ডলফিন মাছ। ধরা পড়া এসব ডলফিনকে অনেক সময় জেলেরা মেরে ফেলে। এভাবে সমুদ্রে কমছে ডলফিনের সংখ্যা। সচেতন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটকের অভাবে সেন্টমার্টিন ক্রমশ মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে রাত হলেই চলে উচ্চৈঃস্বরে গান-বাজনা, বার্বিকিউ পার্টি, কাছিমের ডিম পাড়ার স্থানে অবাধে হাঁটাচলা, লাইট জ্বালানো, দ্বীপের চারদিকে নৌভ্রমণ, দ্বীপের সৈকতে সাইকেল, মোটরসাইকেল চালানোর ফলে সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সেন্টমার্টিন ভ্রমণে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ৪ ধারায় নীতিমালা থাকলেও হচ্ছে না যথাযথ বাস্তবায়ন। সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই ন্যূনতম মাথাব্যথা। সেন্টমার্টিন দ্বীপ আমাদের জাতীয় সম্পদ। সৌন্দর্যঘেরা লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে সর্বপ্রথম প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হব। সচেতন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন স্থান বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে, কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষ উদাসীন! করোনাকালে পর্যটকদের পদচারণা না থাকায় সেন্টমার্টিনসহ দেশের পর্যটন স্থানগুলো ফিরে পেয়েছিল তাদের চিরচেনা প্রাকৃতিক রূপ। কিন্তু করোনার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই সেন্টমার্টিন হয়ে উঠেছে পর্যটনমুখর। পর্যটকদের অসচেতনতার ফলে দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে দ্বীপটি।

তাই সরকারের এটি সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে এখনই সজাগ হতে হবে। সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়মিত অভিযান পরিচালনাসহ আইনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে; তা না হলে দ্বীপটি অচিরেই সাগরে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট arifulislam58702@gmail.com

পাঠকের মতামত: