কক্সবাজার, শনিবার, ২১ নভেম্বর ২০২০

মাদ্রাসা বোর্ডের সব কার্যক্রম হবে অনলাইনে

মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালনার জন্য গঠিত বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে দেশের নানান প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লোক ছুটে আসে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই নানানভাবে দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন। আর এ বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রমকে আধুনিকায়নের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে ভাবছে বোর্ড।

রাজধানীর মাদ্রাসা বোর্ডে সরেজমিনে ঘুরে নানান অনিয়ম আর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের ভোগান্তি নজরে আসে। এ ভোগান্তি কমাতে বোর্ডের ভাবনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ জার্নালকে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা জানান চেয়ারম্যান প্রফেসর কায়সার আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছি। আমাদের অফিসাররা সর্বদা মানুষের সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা সব ধরনের প্রতারণা মোকাবিলায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু ফাঁক-ফোকর থেকে যায়।’

‘বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেক লোক আসায় কিছু সমস্যা হয় বলে আমরা জানতে পেরেছি। অনেক অঞ্চল থেকে অনেক ধরনের লোক আসায় প্রতারকরা সুযোগ পেয়ে যায়। অনেক লোক আসেন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। যারা এসে সহজেই কাজ করিয়ে নেয়ার জন্য দালালদের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু তারা বোঝেন না যে, এরা প্রতারণা করছে। এই কাজ এমনিতেই কিছুদিনে হয়ে যেত। অনেকে আবার আসেন কারো মাধ্যমে, আর যার মাধ্যমে আসেন তিনি হয়তো আগেই বলে দেন- অমুকের কাছে যান। এর ফলে তিনি আমাদের বোর্ডে আসার আগেই প্রতারণার শিকার হয়ে বসেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা বেশ কিছু পরিকল্পনাও নিয়েছি। ব্যাংকের যে বিষয়টি এটা আশা করি আর অল্প কিছুদিনের মধ্যে হয়ে যাবে। আমরা সোনালী ব্যাংকের সাথে একটি চুক্তি করবো যার ফলে যাদের দরকার তারা দেশের যে কোনো প্রান্তে সোনালী ব্যাংকের যে কোনো শাখায় টাকা জমা দিতে পারবেন। ঢাকাতে এসে নির্দিষ্ট কোনো শাখায় জমা দিতে হবে না। টাকা জমার পর রশিদের নম্বর অনলাইন আবেদনে যুক্ত করে দিলেই হবে।

পুরো প্রক্রিয়া কেমন হবে এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যাটা হয় ‘নেম কারেকশনে’। এছাড়া বয়স পরিবর্তনে এসেও অনেক লোক ভোগান্তিতে পড়েন। তাই আমরা নাম এবং বয়স বিষয়ক যাবতীয় সমস্যা অনলাইনে সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা চেষ্টা করছি সেবা গৃহীতাদের যাতে বোর্ড পর্যন্ত না আসতে হয়। এরপর আমরা আরো চেষ্টা চালাচ্ছি সব ধরনের ডকুমেন্ট রিইস্যু করা, ডুপ্লিকেটসহ অন্যান্য বিষয় অনলাইনে করার। যাতে কারো আর স্বশরীরে বোর্ডে হাজির হতে না হয়।’

‘তবে, দু-তিনটা বিষয় থেকে যাবে যা আমরা চাইলেও কোনোভাবে অনলাইনে করতে পারবো না। অন্য যেগুলো সম্ভব আমরা দ্রুত তা অনলাইনে নিয়ে আসবো।’

অনেক সময় নাম পরিবর্তনে বেশি সময় লাগে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে কায়সার আহমেদ বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে দুটো মিটিং করে থাকি। যেখানে যারা নাম এবং বয়স পরিবর্তন করতে চান তাদের উপস্থিত থেকে কী কারণে করতে চাচ্ছেন তা জানাতে হয়। মূলত, নাম পরিবর্তনের দুটো ভাগ আছে। ১) নামের আক্ষরিক সংশোধন, ২) নামের বিস্তর ফারাক। নামের আক্ষরিক সংশোধনের জন্য অনেকে মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করেন, যার ফলে অন্যদের কিছুটা দেরি হয়। আমরা গত কয়েকমাস আগে এ বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি, যে এটা যদি অনলাইনে করা যায় তাহলে অন্যদের কাজগুলো দ্রুত হয়ে যাবে।’

‘আমরা চাইলেই সপ্তাহে একটা করে সংশোধনের মিটিং করতে পারি না। কারণ যাচাই-বাছাইসহ আরো অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়। আর এই কারণে আমরা ১৫ দিন পর পর মিটিং করি, যার ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক কিছু সময় বেশি লাগে।’

করোনাভাইরাসের কারণেও কিছু কাজ বিলম্ব হচ্ছে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, ‘যাদের বয়স সংশোধন করা দরকার তাদের আমরা সংশোধনীয় মিটিংয়ে স্বশরীরে উপস্থিত হতে বলি। কিন্তু করোনার মহামারির মধ্যে আমরা চাইলেও এখন শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তাদের উপস্থিত হতে বলতে পারি না। আমরা এটাও অনলাইনে করার কথা ভাবছি। আমরা মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে যদি কাগজপত্র এনে সম্ভব হয় তাহলে আমরা তাও করবো।’

প্রসঙ্গত, সরেজমিনে ঘুরে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে দালালদের আনাগোনা দেখা যায়। এসময় একাধিক ভুক্তোভোগী সাথে কথা বলে তাদের ভোগান্তির বিষয় জানা যায়।

ভুক্তোভোগীদের অভিযোগ

সরেজমিনে ঘুরে প্রতিবেদকের কথা হয় একাধিক ভুক্তোভোগীর সাথে। তারা জানান, তাদের বাজে অভিজ্ঞতার কথা। জানান, দালালদের টাকা দিলেও বছরের পর বছর ঘুরে সমাধান মেলেনি।

রহিমা বেগমের মেয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন ২০১৭ সাল থেকে। তিনবছর ধরে কয়েকদফায় চেষ্টা চালিয়ে তিনি তার কাজ করিয়েছেন গত পরশু। তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমার মেয়ের পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সার্টিফিকেটে নাম ভুল আসছিলো। আমি ২০১৭ সালের দিকে নাম পরিবর্তনের আবেদন করি। তখন আমি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিই। এরপর এফিডেভিট করে ব্যাংকে টাকা জমা দিই। পরে আমাকে জানানো হয় আগামী ১-২ মাসে মধ্যে মিটিংয়ে আসবে আমার নাম। কিন্তু আজ প্রায় দুই-আড়াই বছর ধরে ঘুরছি। সবে গত পরশু আমার মেয়ের নাম পরিবর্তন হলো। আমি এভাবে ঘুরতে ঘুরতে বাজে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি।

অপর ভুক্তোভোগীর নাম মাসুদ। তার বাড়ি বরিশাল। তার নামে ভুল হয়েছিলো। তার সার্টিফিকেটে নাম মো. মাছুদ। ‘সু’ এর স্থানে এসেছে ‘ছু’। বাড়ি তার বরিশালে। দীর্ঘদিন এভাবেই চলছিলেন তিনি। তবে চাকরির জন্য এবার নাম ঠিক না করলেই নয়। মাসুদ ২০১৮ সালে নাম সংশোধনের আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বছরখানেক কয়েকবার এসেছেন বোর্ডে। শেষ পর্যন্ত ১৬ আগস্ট তার কাজটি হয় দালালের সহযোগিতায়।

মাসুদ বলেন, এই বছরে চারবার এসেছি। কোনো না কোনো কারণে কাজ হয় না। শেষ পর্যন্ত দালালকে ১ হাজার দিয়ে কাজ হয়েছে। তিনি বলেন, কেন যে ভুলটা করলাম। আগেই যদি দালালকে টাকাটা দিতাম, তবে আমার এতোবার ঢাকায় আসা লাগতো না।

দিনাজপুরের কাহারোল থেকে নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য এসেছেন মিজানুর রহমান। তিনি তার মাদ্রাসা থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেবার সময়েই জানিয়ে দেয়া হয়, এক দালালের সহযোগিতা নেবার কথা। তিনি ঢাকায় আসার আগেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন ৫ শ টাকা। অপেক্ষা করছিলেন আরমান নামে সেই লোকের।

তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, যোগাযোগ করে জানাই ভাগিনার জেডিসি সার্টিফিকেটের বয়স সংশোধন করতে হবে।

তিনি জানান, বোর্ডের ভেতরেই দেখা হয় তার সাথে। কথা বলার জন্য নিয়ে যান একটু পাশে। আরমান দাবি করেন, ১৮ বছর ধরে এই বোর্ডের সকল কাজ করছেন তিনি। কোনো কাজই বিষয় না। বয়স পরিবর্তনের জন্য এফিডেফিট ও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এরপর এই কাগজ নিয়ে সোনালী ব্যাংকে জমা দিতে হবে ৫ শ টাকা। এসব কাজ করবার পর অপেক্ষা করতে হবে বোর্ড মিটিংয়ের জন্য। এই কাজের জন্য ৬ থেকে ১ বছর সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

এফিডেভিড ৩ শ টাকা ও পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের জন্য তাকে দিতে হবে ১৫ শ টাকা। কোন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবেন জানতে চাইলে বলেন, যে পত্রিকা বোর্ড গ্রহণ করে। এর জন্য সোনালী বার্তা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এই পত্রিকা ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকার বিজ্ঞাপন গ্রহণ করা হয় না। আর এই আরমান সোনালী বার্তা পত্রিকার একজন ‘সাংবাদিক’।

প্রতারকদের ফাঁদ

সরেজমিনে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন প্রতারকের সাথে যোগাযোগ করতে হয় প্রতিবেদককে। ভিন্ন পরিচয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নানান প্রলোভন দেখিয়ে দ্রুত কাজ করে দেয়ার প্রস্তাব দেন। তবে এর জন্য দাবি করেন মোটা অঙ্কের টাকা।

তিনজন দালালের ভিডিও প্রতিবেদন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছেন আবুল বাশার। তিনি কাজ করেন ‘দৈনিক সোনালী বার্তা’ নামের একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে। যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে জানান, তিনি কাজ করে দেবেন। প্রথমে এফিডেভিট এবং পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এরপর ব্যাংকে টাকা জমা দেয়া লাগবে। দ্রুত কাজ করা যাবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে স্যারদের সাথে কথা বলে দেখতে হবে। হলে জানাবো, রাতে ফোন দিয়েন।

রাত ৮টার দিকে ফোন করা হলে বাশার জানান, তিনি কথা বলেছেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে একটু চাপ আছে। তাই তিনি একটু সময় চান। তবে, তিনি আশ্বাস দেন, অফিসারদের ২-৩ হাজার টাকার মধ্যে কাজ হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় দালাল, সামছুল হুদা (জসিম)। তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের সামনে বিভিন্ন বই বিক্রি করেন। প্রথমেই নানান কথার ছলে তিনি বলেন, আগে বিজ্ঞাপন দিয়ে অন্যান্য কাজ করতে হবে। এরপর তিনি, এক লোকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন, যিনি সার্বিক বিষয়ে সহোযোগিতা করবেন। তবে, তিনি মোটোমুটি ৫ হাজার টাকার মধ্যে মিটিংয়ে তুলে দিতে পারবেন। বয়স পরিবর্তন, নাম পরিবর্তনসহ আরো বেশ কিছু কাজ করেন তিনি।

আরো পড়ুন: মাদ্রাসা বোর্ড যেন ‘দালালের আখড়া’

ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আর মাত্র কদিন পরেই একটা মিটিং আছে। তার সাথে দ্রুত টাকা নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে তুলে দিতে পারবেন। তবে, তিনি জানান, টাকা লাগবে ৫-৬ হাজার। যেহেতু দ্রুত কাজ করতে হবে তাই টাকার পরিমাণ একটু বেশিও লাগতে পারে। তিনি পরদিন প্রতিবেদকে মাদ্রাসা বোর্ডের সামনে দেখা করতে বলেন। এছাড়া জানান, তিনি থাকেন বোর্ডের পাশ্ববর্তী সরকারি কোয়াটারে।

জসিম, কর্থাবার্তার এক পর্যায়ে জানান, বোর্ডের এক নেতা এসব কাজ করেন। সেই নেতা নিয়মিত বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে বসে চা খান। এবং তার সাথে সেই নেতার খুব ভালো সম্পর্ক। এসব কাজ নেতা করলেও তিনি নেতাকে বেশি কিছু বলতে পারেন না। কারণ তিনি কিছু বললে ওই নেতা তাকে বোর্ডের সামনে দোকান বসাতে দেবেন না।

তৃতীয় প্রতারণ নিজেকে পরিচয় দেন, আয়মান নামে। স্থানীয়রা তাকে আরমান নামেও চেনে। তিনি জানান, সবচেয়ে কম রেটে কাজ করে দেন তিনি। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে মূল ফটকে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলেন প্রতিবেদকের সাথে। তিনি বলেন, ‘তিনি বোর্ডেরই কর্মকর্তা।’ তিনি সর্বনিম্ম যে রেটে কাজ করতে পারবে তা চাইলেই অন্য কেউ করতে পারবে না। কারণ তিনি বোর্ডে কাজ করেন।

পাঠকের মতামত: