কক্সবাজার, বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০

হোয়াইক্যং এর ইয়াবা কায়েস অপ্রতিরোধ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা পদক্ষেপের পরও থামছে না ইয়াবা প্রবেশ। অথচ ৩ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তালিকাভুক্ত এবং এর বাইরে থাকা মাদক কারবারিরা আটক হয়েছে। কিন্তু অধরা থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ ইয়াবার নেপথ্য নায়করা। নানা কৌশলে তারা মাদকের এ অবৈধ ব্যবসা জিইয়ে রেখেছে। তারই একজন টেকনাফের হোয়াইক্যং একালার গোলাম সরওয়ারের ছেলে মোঃ কায়েস উদ্দিন (২৯)।

মহামারী করোনার মধ্যেও টেকনাফ এলাকায় মাদকের জাল ছড়িয়ে রেখেছে কায়েস ও তার সিন্ডিকেট। টেকনাফের বিভিন্ন চোরাই পথ ব্যবহার করে পাশ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে মাদক নিয়ে আসে তারা। সে মাদক মামলায় জেল থেকে বের হয়ে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রীতিমতো চালিয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসা।

টেকনাফ থেকে নদী পথে বিপুল ইয়াবা এনে তা পাচার করে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক হওয়া টেকনাফের কায়েস এখন আন্ডার ওর্য়াল্ডের ডন। এক সময়ে ভবঘুরের ফেরারী এখন বিলাস বহুল রঙ মহলে বসে নিয়ন্ত্রণ করে ইয়াবার জগত।

সে ইয়াবাসহ একাধিকবার গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান। প্রতিবারই ছাড়া পেয়ে পুণরায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

কায়েস রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ইয়াবাসহ নানা অপরাধে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
হোয়াইক্যং এলাকার প্রতিটি অপকর্মেই তার হাত রয়েছে। তার কারণে এলাকার সমাজ ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সে এলাকায় ইয়াবা ব্যবসায়, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায়, চাঁদাবাজি, ইয়াবা পাচার, মানব পাচারসহ নানা অপকর্মে জড়িত রয়েছে। বিশেষ করে সমাজের খারাপ ও কতিপয় যুবক-যুবতী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ব্যবহার করে মুলত এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে সে।

তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানাসহ জেলার বিভিন্ন থানায় ইয়াবা চালানসহ একাধিক অধিক মামলা রয়েছে। তার কারণে পুরো এলাকাবাসী এখন ভীত সন্ত্রস্ত্র। এলাকায় তার ক্ষমতার প্রভাব এতই বেশি- সাধারণ লোকজন কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি।

এই গডফাদার গোয়েন্দা সংস্থা ও রাষ্ট্রের কালো তালিকা ভুক্ত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক কার্যালয় সর্বত্র মহড়া দিয়ে নানান অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অসংখ্য পাচারকারীর পৃথক পৃথক সিন্ডিকেট ছাড়াও তার রয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিচয়ী কিছু দুর্বৃত্ত, অসাধু জনপ্রতিনিধি। এসব বাহিনীর অপশক্তি ব্যবহার করে মিয়ানমার হতে হাজার হাজার ইয়াবা এনে সারা দেশে সরবরাহ করে রমরমা বাণিজ্য গড়ে তোলে।

প্রাপ্ত তথ্য জানা য়ায়, ২০১২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে ৭৩০ পিস ইয়াবাসহ মোঃ কায়েস (২৮) হ্নীলা বাজারে র‍্যাপিড একশ্যান ব্যাটালিয়ন র‍্যাব-৭ জালে ধরা পড়েছিল। সে জেল কেটে জামিনে বের হয়ে আবারো মরণ নেশা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। যার থানা মামলা নং-৪৮, তাং ১৯/০৯/২০১২ ইং।

সূত্র জানায়, তার নেতৃত্বে টেকনাফের ১০/১২টি স্পটে প্রকাশ্যে চলছে বিভিন্ন মাদক দ্রব্যের কেনা-বেঁচা। শুধু ব্যবসাতেই সে ক্ষান্ত নয়। এসব স্পটে কায়েসের নেতৃত্বে তার অনুসারীরা মাদক সেবন ও সরবরাহও করছে দাপটের সাথে। এতে চরম উৎকন্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে অভিভাবকরা। আগে তার কিছুই ছিলনা। কিন্তু ইয়াবার বদৌলতে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে। তার রয়েছে প্রচুর অর্থ সম্পদ। এখন টেকনাফসহ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে জায়গা ক্রয় করছে। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য গাড়ি।

তার চলমান ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করতে এলাকার সুশীল সমাজ প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকি ধমকি দেন প্রতি মুহূর্তে। গত কয়েকমাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার এলাকায় সুশীল সমাজকে অস্ত্র মহড়া দিয়ে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের সাঙ্গ পাঙ্গদের অস্ত্র মহড়ার কারনে এলাকায় মুখ খোলতে নারাজ অনেকে। তাদের সংঘবদ্ধ একটি দল সবসময় মোটরসাইকেল ও অস্ত্র নিয়ে ঘুরাফেরা করে তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলেনা।

এদিকে কায়েসের অবৈধ পন্থায় করা বিভিন্ন স্থানে বিলাস বহুল প্রসাদ, দালান ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, একাধিক নানান মডেলের যানবাহন গড়ার বিষয়টি এখন এলাকায় আলোচ্য বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
অভিযুক্ত ইয়াবা গড় ফাদার কায়েস কালো টাকা ও শক্তির প্রভাবে নিরাপদে চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাড়ি টেকনাফ এলাকায় হওয়ায় কালো জগতে নাম লেখাতে বেগ পেতে হয়নি। তাই রাতারাতি বড় লোক হওয়ার স্বপ্নে জড়িয়ে পড়েন মাদক ব্যবসায়। বিভিন্ন কায়দায় মাদক পাচার করত সে। কখনও মোটরসাইকেলে আবার কখনও পায়ে হেটে আগে থেকে ঠিক করা স্পটে আসক্তদের মাদক পৌছে দেয় কায়েস ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা। লেনদেন হয় বিকাশের মাধ্যমে। দুপুর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত রমরমা ব্যবসা চলে। কায়েসের সিন্ডিকেটের উঠতি বয়সী কয়েকজন যুবক এসব স্পটে মটরসাইকেলে করে প্রশাসনের আনাগোনা লক্ষ রাখে। প্রশাসনিক চাপ এড়াতে পুলিশের সোর্স হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয় তারা। এছাড়াও গত ২৩ আগষ্ট ইয়াবার টাকায় কেনা তার একটি গাড়ি ২০ হাজার ইয়াবাসহ সাতকানিয়া থানায় আটক করা হয়। এসময় তার গাড়ির চালক হোয়াইক্যং এলাকার আবদু রাজ্জাক ও হেলপার বোয়ালখালী এলাকার ইয়ার মোহাম্মদকেও আটক করা হয়।

এদিকে আরও জানা গেছে, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর যেসব মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে ছিল, তাদের অনেকে এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। পুরনো গডফাদারদের পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন গডফাদার। যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, টেকনাফে যে সমস্ত ইয়াবা ও মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে তাদের ব্যাপারে পুলিশ খবরা খবর রাখছে। সময় মতো আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সেক্ষেত্রে ইয়াবা ব্যবসায়ী যতো বড়ই প্রভাবশালী হোক না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যদিও কায়েস ফের ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত থাকে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, টেকনাফের সচেতন মহলের দাবী। যুব সমাজকে খাদের কিনার থেকে টেনে তুলতে মাদকের গডফাদারদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। টেকনাফের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তুলতে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের আরও সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের চলমান মাদক বিরোধী জিরো টলারেন্স সফল করতে দুটি আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পন হয়ে গেছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের ব্যাপার ২য় দফা তালিকায় এই বেপরোয়া এই মাদক ব্যবসায়ীর নাম ছিলনা। ২য় দফায়ও তার নাম তালিকায় না থাকা এই নিয়ে চলছে টেকনাফ জুড়ে নানা গুঞ্জন। তাকে শিঘ্রী আইনের আওতায় এনে টেকনাফ কে কলঙ্কমুক্ত করা হউক এবং কায়েসসহ ছোটবড় সকল সিন্ডিকেট সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহল।

পাঠকের মতামত: