কক্সবাজার, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০

৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সংযুক্তি ৫৮৬ পৃষ্ঠা, ১৩ সুপারিশ

সিনহা রাশেদ হত্যা: স্বরাষ্ট্রের তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে নেপথ্যে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’

মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সুপারিশ রয়েছে ১৩টি। প্রতিবেদনে কী রয়েছে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খোলেননি। তবে একটি দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে জানায়, সিনহার ঘটনার পেছনে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ থাকতে পারে বলে মত দিয়েছে কমিটি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য সমাধানসূত্রও সেখানে উল্লেখ করা হয়। স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্তে পুলিশের বাইরে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে, যারা প্রভাবমুক্ত হয়ে তদন্ত করবে। অস্ত্র ও গুলির আইনানুগ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও এতে আলোকপাত করা হয়। প্রতিবেদনে সিনহার ঘটনার কারণ ও উৎস শনাক্ত করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গতকাল রাতে সমকালকে বলেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করেছি। ১৩ দফার সুপারিশে এমন কিছু বাস্তব বিষয় আনা হয়েছে, সেটা গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুফল পাবে। মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রে আগামীতে কী করা যায়, তা-ও প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে বা সুপারিশে কী রয়েছে, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তদন্ত কমিটির প্রধান।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুরে এপিবিএনের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা। এ ঘটনার তদন্তে ৪ আগস্ট মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কমিটির অপর তিন সদস্য হলেন- অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন খান, লে. কর্নেল এস এম সাজ্জাদ হোসেন ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাহজাহান আলী। তিন দফায় সময় বাড়ানোর পর ৩১ দিনের মাথায় আলোচিত এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিল কমিটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমার সময় কমিটির সব সদস্যই উপস্থিত ছিলেন। সিনহা হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। সূত্র জানায়, সিনহার ঘটনায় কক্সবাজারের পুলিশ প্রশাসন দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে সঠিকভাবে বিষয়টি তদারক করতে পারেনি বলে কমিটি মত দিয়েছে। বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি সেখানকার এসপি।

অন্য একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কেন এবং কী কারণে কক্সবাজার ও টেকনাফ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, তাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।

সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সদস্যরা রিপোর্ট তৈরির সময় নিজেরা সব দিক চুলচেরা বিশ্নেষণ করেছেন। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে চারজনই একমত পোষণ করেন। সার্বিক তথ্য পর্যালোচনায় একমত হওয়ায় চারজনই প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। চেকপোস্টে সিসিটিভি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও এসেছে। ক্রাইম সিন সংরক্ষণে আরও মনোযোগী হতে পুলিশকে নির্দেশনার বিষয়টি প্রতিবেদনে রয়েছে। এ ছাড়া গুলিবর্ষণের ঘটনায় নির্বাহী তদন্তের সময় সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা আরও তীক্ষষ্ট নজরদারির মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। এমনকি এফবিআইর আদলে তদন্ত সংস্থা গঠন করার কথা বলা হয়, যাতে পুলিশের বাইরেও একটি তদন্ত সংস্থা থাকতে পারে। যেখানে চাইলে ভুক্তভোগীরা যেতে পারবেন। এ ধরনের তদন্ত সংস্থা হলে অন্যান্য তদন্ত সংস্থার মধ্যে আরও ভালো কাজ করার মনোবৃত্তি গড়ে উঠবে। তবে যৌথ তদন্ত দল গঠনের ব্যাপারে কমিটিতে থাকা পুলিশ সদস্য নোট অব ডিসেন্ট (অসম্মতি) দিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানায়।

কমিটি বলেছে, যথাযথ আইনি ভিত্তি ছাড়াই এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত না করে পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত ‘শুধু কৃতিত্ব’ পেতে ওই গুলির ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার গুলি করার সিদ্ধান্ত ছিল ‘হঠকারী’। ডাকাত আসার তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না করেই অভিযান শুরু করা হয়। অভিযান শুরুর আগে অতিরিক্ত ফোর্সও নেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে পাহাড়ে গিয়ে সিনহার ভিডিওচিত্র তৈরির বিষয়টিও এসেছে। এর সঙ্গে মূল ঘটনার কী ধরনের যোগসূত্র রয়েছে, সে তথ্য তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। এতে ওসি প্রদীপ কুমার দাশের দুটি ব্যক্তিগত অস্ত্র থাকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পর কক্সবাজারের পুলিশ বিষয়টির সংবেদনশীলতা, তদারক ও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। ডাকাত সন্দেহে যেসব গ্রামবাসী পরিদর্শক লিয়াকতকে তথ্য দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজনের তিন ধরনের পরিচয় পাওয়া গেছে। লিয়াকত বলেছিলেন, ওই ব্যক্তি কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি। প্রদীপ বলেছিলেন, সহসভাপতি। আরেকজন বলেছেন, কমিউনিটি পুলিশের সদস্য।

৮০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সঙ্গে ছবির অ্যালবাম রয়েছে ২১ পৃষ্ঠার। এ ছাড়া সংযুক্তি আছে ৫৮৬ পৃষ্ঠা। তদন্ত কমিটি ৬৮ জনের বক্তব্য রেকর্ড করেছে।

গতকাল প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, এতে কী আছে, সেটি এখনও দেখা হয়নি। সচিব প্রতিবেদনটি বিশ্নেষণ করে দেখবেন। যেটা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী কাজ করা হবে। পরবর্তী সময়ে আদালত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সিনহা হত্যার ঘটনায় পুলিশি তদন্ত চলছে। বিচারাধীন বিধায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা সম্ভব নয়। আদালতকে তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হবে। আদালত তদন্তের জন্য হয়তো অফিশিয়ালি এটা নিয়েও নিতে পারেন। সেটি আদালতের এখতিয়ার। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নামে অভিযোগ আসবে, তাদের বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর কমিটির প্রধান মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ বাহিনী আইনশৃঙ্খলার জন্য যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে; সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যার ঘটনায় তাদের সেই ভূমিকা কোনোভাবেই ম্লান হবে না।

মিজানুর রহমান আরও বলেন, এক মাসের বেশি সময় তদন্ত করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি প্রস্তুত করতে কর্মপরিকল্পনা করা হয়। গত ৩ তারিখ থেকে কী কী করা হয়েছে, তার সবকিছু বিস্তারিত সংযুক্ত আছে। ঘটনার উৎস, কারণ এবং এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার বিষয়ে সুপারিশের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ছিল। সেই আলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্নেষণ করে প্রতিবেদনে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

মিজানুর বলেন, তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলগুলোতে রাত ৯টার দিকেও গেছেন। রাতে এপিবিএনের ফোর্স নিয়ে ডেমো করা হয়েছে, বোঝার চেষ্টা করেছি। যে পাহাড়ে মেজর সিনহা গেছেন, সেই পাহাড়েও গিয়েছি। ওখানকার লোকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্নেষণ করে উৎস, কারণ ও সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। বিষয়টি এখন ঊর্ধ্বতন স্যাররা দেখবেন।

কমিটিকে প্রথমে সাত কর্মদিবসে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও পরে তিন দফা সময় বাড়ানো হয়। এক মাসের বেশি সময় নেওয়া তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থলে গিয়ে গণশুনানি করে। এ সময় প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য শোনার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপ, লিয়াকতসহ পুলিশ সদস্যদের জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, কমিটি ঘটনার উৎস ও কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে করণীয়-সংক্রান্ত সুপারিশ দিতে কিছু মৌলিক প্রশ্নের জবাব খোঁজ করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ঘটনাটি তাৎক্ষণিক, নাকি পূর্বপরিকল্পিত এবং নির্দেশদাতা কে- তা খুঁজে বের করা। বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সমকাল

পাঠকের মতামত: