কক্সবাজার, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০

এনামুল এত টাকা পেলেন কোথায়?

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সহকারী পরিচালক এনামুল হক বর্তমানে সংস্থাটির ময়মনসিংহ জেলা অফিসে কর্মরত। সম্প্রতি লিবিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার নূরজাহান আক্তারের ব্যবসায়িক পার্টনার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলায় নূরজাহান ও এনামুলের বিশাল ফার্নিচারের দোকান। সেখানে প্রায় দুই কোটি টাকার ফার্নিচার রয়েছে। অন্যান্য ব্যবসাও রয়েছে এনামুলের। বিএমইটির চাকরিই এনামুল হকের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে। কয়েক বছরে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন তিনি। বর্তমানে ঢাকায় তার তিনটি ফ্ল্যাট। গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় কয়েক বিঘা জমি। শহরে বাড়ি করার জন্য মূল্যবান জমিও কিনেছেন তিনি। ব্যাংকেও রয়েছে অনেক টাকা। এনামুলের অফিসের সহকর্মী, আত্মীয়স্বজনসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এনামুল এত টাকা পেলেন কোথায়? এনামুল হকের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার বিহি গ্রামে। তার বাবা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে এনামুল হক ছোট। এনামুল হক ২০০৭ সালে বিএমইটিতে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। বিভিন্ন শাখায় চাকরি করেছেন তিনি। ময়মনসিংহে বদলির আগে তিনি ঢাকা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের এডি ছিলেন। লিবিয়ায় মানব পাচারে অভিযুক্ত ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নূরজাহানের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে দুটি কারণে। এক. একই মন্ত্রণালয়ে কাজ করা, দুই. চাকরির পাশাপাশি নূরজাহানের রিক্রুটিং ব্যবসা। মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তারের পর নূরজাহানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুরে ৬০ ফিট
সড়কের অদূরে মধ্য পীরেরবাগের ২৮১/১২/এ হোল্ডিংয়ের ১০ তলাবিশিষ্ট যমুনা ভবনের আট তলার পশ্চিম পাশের ফ্ল্যাটটি এনামুল হকের। অনুসন্ধান শুরুর পরপরই জানা যায়, ওই ফ্ল্যাটটি বিক্রির জন্য ক্রেতার সঙ্গে দেনদরবার করছেন এনামুল। সম্প্রতি ওই ভবনে গিয়ে কথা হয় দারোয়ান হায়দার আলীসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের একজন জানালেন, এনামুল হক ফ্ল্যাটটি বিক্রির জন্য ৬৩ লাখ টাকায় দরদাম করেছেন একজন ক্রেতার সঙ্গে। গত ১৭ আগস্ট সেটি রেজিস্ট্রি হওয়ার কথা ছিল। গত ২০ সেপ্টেম্বর ওই ভবনের একজন নিরাপত্তা কর্মী জানালেন, এনামুল হক ফ্ল্যাটটি এক শিক্ষকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
এনামুল হক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন মিরপুর ২ নম্বরে এ ব্লকের তিন নম্বর সড়কে। বাড়ির হোল্ডিং নাম্বার দুই। সাত তলা বাড়িটির সাত তলায় দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন প্রায় চার বছর আগে। এ বাড়ি থেকেই তিনি ময়মনসিংহ অফিসে যাতায়াত করেন। বাড়িটির পঞ্চমতলায় থাকেন এনামুল হকের ভাই শাহিন। এ ফ্ল্যাটটিও এনামুল হকের কেনা। তবে এ ব্যাপারে শাহিন সমকালের কাছে দাবি করেছেন, তিনি নিজেই ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি আড়াই কাঠা জমির ওপর নির্মিত। গ্রীনওয়ে প্রপার্টিজ লিমিটেড নামের একটি আবাসন কোম্পানি বাড়িটি নির্মাণ করেছে। বাসভবনের নাম ‘রানী মহল’। প্রতি তলায় দুটি করে ইউনিট। সাত তলায় দুটি ইউনিট জমির মালিক নিগার সুলতানা রানীর কাছ থেকে এনামুল কিনেছেন। দুটি ইউনিট একসঙ্গে করে সপরিবারে বসবাস করছেন এনামুল হক।

নিগার সুলতানা রানী সমকালকে বলেন, তিনি এনামুল হকের কাছে ওই ভবনের তিনটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন। একটি পঞ্চম তলায় এবং অপর দুটি সাত তলায়। পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটটি এনামুলের ভাইয়ের নামে দেওয়া। অবশ্য এ ফ্ল্যাটের টাকা এনামুল হক পরিশোধ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সপ্তম তলার ফ্ল্যাট বাবদ তিনি এনামুলের কাছে এখনও কয়েক লাখ টাকা পাবেন। বকেয়া টাকা চাইলেই নানাভাবে এনামুল হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এনামুলের সম্পদের তথ্য জানতে বগুড়ায় তার গ্রামের বাড়ি খোঁজ নেওয়া হয়। গ্রামে বেশ কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন তিনি। এ ছাড়া বগুড়া শহরের রেলগেটের অদূরে প্রায় ১৬ শতাংশ মূল্যবান জমি কিনেছেন। ভবিষ্যতে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর কাজীপাড়ায় ২০১৫ সালে ফার্নিচার ব্যবসায়ী শাহজাহান কবিরের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করেন এনামুল। ২০১৬ সালে দু’জনের নামে ট্রেড লাইসেন্সও করা হয়। পরে মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নূরজাহান আক্তারের সঙ্গে ২০১৮ সালের জুনে আগারগাঁওয়ে তালতলা বাসস্ট্যান্ডের কাছে যৌথভাবে ফার্নিচারের আরেকটি শোরুম দেন। শাহজাহান কবিরও এটির অংশীদার ছিলেন। তবে তার অর্থ বিনিয়োগ ছিল না। পুরো অর্থ এনামুল ও নূরজাহানের। শোরুম ভাড়া নিতেই জমির মালিককে জামানত হিসেবে অগ্রিম দিতে হয় এক কোটি ১০ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে শাহজাহানকে এ ব্যবসার অংশীদার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এনামুল ও নূরজাহানের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন শাহজাহান। সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা এই জিডির তদন্ত বেশি দূর এগোয়নি।
এদিকে এনামুল হকও বাদী হয়ে ঢাকার আদালতে শাহজাহান কবিরের বিরুদ্ধে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা করেন। ওই মামলায় দাবি করা হয়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই শাহজাহানের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ফার্নিচার ব্যবসার চুক্তি করেন। অংশীদার হিসেবে তিনি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন শুরুতে। পরে আরও ২২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ভবনের জামানত হিসেবে ভবন মালিককে দেওয়া হয়েছিল ৪০ লাখ টাকা। এরপর শাহজাহানের সঙ্গে ব্যবসায়িক মতবিরোধ দেখা দেয়। পরে শাহজাহান এক কোটি টাকার ফার্নিচার বিক্রি বা অন্যত্র সরিয়ে নেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া লাভজনক কোনো প্রতিষ্ঠান করা বা এতে যুক্ত হওয়া একটি শাস্তিযোগ্য ও ফৌজদারি অপরাধ। কর্তৃপক্ষ কোন কোন ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে পারে সেটারও একটি দিকনির্দেশনা আছে। তিনি আরও জানান, সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবসা করছেন- এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দুদক মামলাও করতে পারে। তবে তিনি যে বিভাগে চাকরি করেন, সেই বিভাগই প্রথম তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। ওই বিভাগ ব্যবস্থা নিয়ে যদি কাগজপত্র দুদকে পাঠায় তাহলে সেটা আরও সহজ হয় দুদকের জন্য। এ ধরনের একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে।
জানা গেছে, এক সময় এনামুল হকের দামি প্রাইভেটকার ছিল। একটি দুর্ঘটনার পর তা বিক্রি করে দেন। ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর সকালে মিরপুরের বাসা থেকে নিজের প্রাইভেটকার নিয়ে ময়মনসিংহের অফিসে যাওয়ার পথে গাজীপুরে একটি কাভার্ডভ্যানে ধাক্কা মারেন এনামুল হক। তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। গাড়িতে তার পাশে বসেছিলেন তারই অফিসের সার্ভে অফিসার মো. ইস্রাফিল। ঘটনাস্থলেই ইস্রাফিল প্রাণ হারান। এনামুল সামান্য আহত হন। এরপরই গাড়িটি বিক্রি করে দেন তিনি।
জানতে চাইলে বিএমইটির মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম এনামুলের বিষয়ে সমকালকে বলেন, সরকারি কর্মচারীরা অনুমতি ছাড়া ব্যবসা করতে পারেন না। এনামুল অনুমতি নিয়ে ব্যবসা করছেন কিনা তা তার জানা নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি করলে কোনো প্রকার ছাড় নেই। প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ সম্পর্কে এনামুল হকের বক্তব্য জানতে গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমার কোনো ব্যবসা নেই।’ ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে শাহজাহান কবিরের বিরুদ্ধে মামলার কপি সমকালের কাছে আছে- বিষয়টি জানানোর পর তিনি বলেন, ‘ওটা আমার পারিবারিক বিষয়। কোনো কিছু জানতে হলে সরাসরি দেখা করেন।’ ঢাকায় ফ্ল্যাটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন একটা অনুষ্ঠানে আছি, পরে কথা বলেন।’

পাঠকের মতামত: