কক্সবাজার, সোমবার, ১৬ মে ২০২২

ঈদ এলে কষ্ট বাড়ে টেকনাফের একরামুলের পরিবারে

আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন, টেকনাফ::

জরাজীর্ণ ভবনের দোতলায় উঠতেই সামনে পড়ে একরামুল হকের কক্ষটি। কড়া নাড়তেই সামনে আসেন স্ত্রী আয়েশা বেগম। কক্ষের ভেতরে চারটি প্লাস্টিকের চেয়ার ও একটি টেবিল। টেবিলের এক পাশে রক্তমাখা একটি সাদা চশমা। দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের দেয়ালে হাতে লেখা কিছু স্মৃতিকথা আর প্রশ্ন। বাবার (একরামুল) উদ্দেশে দেয়ালে লেখা প্রশ্নগুলোর জবাব চার বছরেও পায়নি কিশোরী দুই মেয়ে তাহিয়াত হক ও নাহিয়ান হক।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তাহিয়াত ও নাহিয়ানের বাবা একরামুল হক। ঘটনার সময় তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। ১২ বছর ছিলেন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।

একরামুলের ‘হত্যাকাণ্ডের’ সময় মেয়েদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন শোনা যায় একটি ফোনকলের রেকর্ডে। সে সময় একরামুলের মুঠোফোনে মেয়ে ফোন করলে রিসিভ হয়ে যায়। তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগমের মুঠোফোনে রেকর্ড হয়ে যায় গুলির শব্দ-শোরগোল। এই অডিও ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।

ঘটনার পর গণমাধ্যমে পাঠানো র‌্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, একরামুল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও ইয়াবা গডফাদার। তবে পরিবারের দাবি, একরামুল মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন না। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী এনামুল হক মনে করে একরামুলকে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করা হয়।

পবিত্র ঈদুল ফিতর প্রায় চলে এসেছে। কেমন আছে একরামুলের পরিবার? মেয়ে দুটোর লেখাপড়ার কী অবস্থা? এসব বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের খালিয়াপাড়ায় একরামুল হকের পৈতৃক বাড়িতে তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়।

আবেগাপ্লুত আয়েশা বেগম বলেন, ‘চার বছর ধরে আমাদের কোনো ঈদ নেই। একরামুল থাকতে দুই মেয়েকে নিয়ে বাজারে গিয়ে নতুন জামাকাপড় কিনে দিতেন।মেয়েদের আবদার পূরণ করতেন। দুই মেয়েকে ঈদের দিন মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। এখন ঈদ এলে আমাদের কষ্ট বাড়ে। করোনার দুই বছর কেটে গেল, এখন রোজা যাচ্ছে, আসছে খুশির ঈদ। কিন্তু আমরা কেমন আছি, কীভাবে কাটছে আমাদের সংসার, কেউ খোঁজ নেয়নি।’

একরামুলের কক্ষে ঢুকলে প্রথমেই চোখ পড়ে মেয়ে তাহিয়াত হকের হাতে লেখা, ‘মানুষ মানুষকে গুলি করে মারে, নির্দোষ মানুষ কেন মরে?’, আরেক জায়গায় লেখা, ‘ভূতকে ভয় লাগে না, মানুষকে ভয় লাগে’, ‘আব্বু তুমি কোথায়? তুমি কি আর জীবিত ফিরে আসবা না? ‘আমাদের আব্বু হত্যার কি কোনো বিচার পাব না?’ দেয়ালের লেখাগুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পায়নি একরামুলের মেয়েরা।

বিচার নিয়ে শঙ্কা
স্বামী ‘হত্যার’ বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আয়েশা। বললেন, ১২ বছর ধরে একরামুল উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর পুরো পরিবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত। বিপদে মানুষের পাশে থাকতেন বলেই জনগণ তিনবার তাঁকে কাউন্সিলর বানিয়েছিলেন। মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অথচ তাঁকে মাদক ব্যবসায়ী অপবাদ দিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করা হলো।

দুই মেয়ে রাতে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করে বলে জানান আয়েশা। তিনি বলেন, লেখাগুলো মুছেও ফেলা যাচ্ছে না। মেয়েরা বলে, বাবার বিচার না হওয়া পর্যন্ত দেয়ালের লেখা এভাবেই থাকবে। বাইরের লোকজন এলে যেন বুঝতে পারেন, তাদের বাবা পরিস্থিতির শিকার। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের বুঝিয়েছি, কান্নাকাটি করে লাভ নেই, বাবা আর ফিরে আসবে না। পড়াশোনায় মন দাও। কিন্তু বাবার স্মৃতি সামনে এলে তারা স্থির থাকতে পারে না। কয়েক দিন পরে ঈদ। বাবাকে নিয়ে মেয়েদের ঈদের স্মৃতি অনেক। কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি মেয়েরা ভুলবে কী করে? গত চার বছর ঈদ কেটেছে নির্জন কক্ষে। এবারের ঈদও কাটবে কান্নাকাটি করে।’

২৬ মে একরামুল ‘হত্যার’ চার বছর পূর্ণ হচ্ছে। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে আয়েশা বলেন, ‘চার বছরে কেউ আমাদের খোঁজ নিল না। আয়রোজগারের কোনো পথ নেই। মেয়ে দুটোর লেখাপড়া নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি।’

বড় মেয়ে তাহিয়াত পড়ছে একাদশ শ্রেণিতে আর নাহিয়ান দশম শ্রেণিতে। বাবার মৃত্যুর পর লেখাপড়ায় তেমন মনোযোগ নেই তাদের। আয়েশা বললেন, দিন যত যাচ্ছে, মেয়েদের কষ্ট তত বাড়ছে। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কান্না থামবে না। কান্নাই এখন তাদের প্রতিবাদের ভাষা।

‘হত্যার’ পর দেশ ও দেশের বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত সরকারিভাবে এর কোনো তদন্ত হয়নি। তখন তাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, মনের দুঃখ বোঝাতে চেয়েছিলেন। দুজন মন্ত্রী আশ্বাসও দিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি। এখনো প্রহর গুনছেন, কখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।

মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে বসে ছিল মেয়ে তাহিয়াত। ১১ মে একরামুলের ৫২তম জন্মদিন। মায়ের মুখে জন্মদিনের তারিখটা জানার পর তাহিয়াতের চোখে জল এল। বলল, ‘চার বছর ধরে চোখের জলে বাবার জন্মদিন পালন করছি। এবারও তা–ই হবে।’

সর্বশেষ চার বছর আগে দুই মেয়েকে নিয়ে জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিলেন একরামুল। তখন কেক কেটেছিল ছোট মেয়ে নাহিয়ান। টিফিনের টাকা জমিয়ে তারা জন্মদিনে বাবাকে কলম ও চকলেট উপহার দিত। বাবার পছন্দের খাবার রান্না করতেন মা। সবাই মিলে সেই খাবার খেতেন। এখন সবই স্মৃতি।

একরামুল তাঁর পছন্দের কিছু খাবার নিজ হাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়াতেন। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ আগের দিন দুই মেয়েকে নিয়ে রুপচাঁদা মাছ রান্না করেছিলেন একরামুল। পরের দিন খাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি।

টেবিলের ওপর রক্তমাখা একটি চশমা। সেদিকে তাকিয়ে আয়েশা বলেন, স্বামীর স্মৃতি বলতে রক্তমাখা এই চশমা ছাড়া আর কিছুই নেই। মেরিন ড্রাইভের পাশে চশমাটি পড়ে ছিল। পরের দিন সকালে এক ব্যক্তি চশমাটি দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু একরামুলের দামি মোটরসাইকেল ও মুঠোফোনগুলোর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আয়েশা বলেন, একরামুলের এমন কোনো সম্পদ নেই, যা দিয়ে মেয়েদের লেখাপড়া ও সংসার চালানো যাবে। ঘটনার দিনও বাড়ির সামনের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে মোটরসাইকেলের তেল কিনেছিলেন। আত্মীয়দের সহযোগিতায় কোনোমতে বেঁচে আছেন তাঁরা। এদিকে চার বছরে মামলার বিচারের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছিল। ২০১৯ সালের ২৫ মে টেকনাফ থানার পুলিশ প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, তদন্তে ঘটনার প্রমাণ না মেলায় মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় একরামুলের স্ত্রী মামলা করতে না পারায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ বিষয়ে গত ২৩ জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয় কমিশন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।

উপযুক্ত প্রমাণসহ একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগমকে ইউএনও কার্যালয়ে সেদিন উপস্থিত থাকতে চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রতিনিধিদল যাওয়ায় শুনানি স্থগিত হয়ে যায়। এরপর আর শুনানি হয়নি। টেকনাফের নবাগত ইউএনও কায়সার খসরু প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করবেন

পাঠকের মতামত: