কক্সবাজার, সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

আজ মহান মে দিবস

আজ মহান মে দিবস। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষদের দিন। শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশেই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বসহকারে দিনটি পালিত হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষ মুজিববর্ষে গড়বো দেশ’।

মে দিবস দুনিয়ার সব শ্রমিকদের এক হওয়ার দিন। আন্তর্জাতিক সংগ্রাম আর ভ্রাতৃত্বের দিন। দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিশ্বের শ্রমিকেরা নানা কর্মসূচি পালন করার কথা। হাজার হাজার শ্রমিকের মিছিলের পথ ভারি হওয়ার কথা। একই পতাকা তলে দাঁড়িয়ে আপোষহীন সংগ্রামের কথা বলা কথা। জাগরণের গান, সংগ্রামের ঐক্য ও গভীর প্রেরণার কথা বলার কথা। কিন্তু করোনা মহামারি কারণে জনসমাগম এড়াতে বাংলাদেশেসহ বিশ্বের মে দিবসের সব অনুষ্ঠান হবে সীমিত পরিসরে।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও মহান মে দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মহান মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে। দিবসটি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্য বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। এছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ (বিএনপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো বিবৃতি দিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো শ্রম নিবিড় উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও হৃদ্যতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, ‘মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক বাজায় রাখা, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, মহামারি করোনাকালে খেটে- খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সবাই সদয় থাকুন। রমজান এবং ঈদকে সামনে রেখে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস সময়মত পরিশোধ করুন। যে কোন ন্যায্য দাবি আদায়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান তিনি ।এই দুঃসময় বেশি দিন থাকবে না। প্রকৃতি আবারো স্বাভাবিক হবে, নিরাপদ হবে আমাদের প্রিয় পৃথিবী। যে কোনো পরিস্থিতিতে আমরা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব।

শ্রমিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের লড়াই সবচেয়ে কঠিন। এই লড়াই জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই। এই আর্থিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে ইতিমধ্যেই কাজ হারিয়েছেন বহু শ্রমজীবী মানুষ। পরিসংখ্যান বলছে করোনা পরবর্তী সময়ে কয়েক কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। তাদের জীবনে নেমে আসবে ভয়ঙ্কর কালো দিন।

করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে কাজ হারিয়ে শ্রমিকরা । কাজা হারিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে দেশে ফিরে এসেছে বহু প্রবাসী শ্রমিক।করোনার পরবর্তীতে আদৌ তারা সেদেশে ফিরে যেতে পারবে কি না তাও অনিশ্চয়তা। এসব শ্রমিকদের জীবনের নেমে এসেছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। তাদের সেই অসহায় ছবি প্রতিনিয়ত ভেসে উঠছে সংবাদ মাধ্যমের পর্দায়।

অনেকে ছুটিতে এসে ফিরতে পারছেন না। কোন রকমে সামান্য সাহায্যে তাদের মুখে জুটছে আহার, সেটাও অনিশ্চিত, কারোর কারোর হয়তো সেটাও জুটছে না নিয়মিত।

করোনায় ভয়াবহতা নেমে এসেছে সব সেক্টরে। এই ভয়ঙ্কর সঙ্কটের দেশে বেসরকারি সেক্টরে হয়েছে ছাটাই। সব শ্রমিকদের যেন কাজ থেকে ছাঁটাই না করা হয় সরকারের তরফ থেকে বলা হলেও বাস্তবটা উল্টো। ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ আজ সম্পূর্ণই অনিশ্চিত। করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশ লকডাউনের আওতায় থাকায় এবার সরকারিভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সারা দেশ কবে মুক্তি পাবে তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দেশের প্রতিটি মানুষ। তবে একদিন না একদিন করোনা-ভীতি থেকে সারা দেশ মুক্ত হবে, আসবে আবার নতুন সকাল, কিন্তু এই শ্রমিকদের জীবনে যে আঁধার নেমে এসেছে সেটা তারা কাটিয়ে উঠবে কীভাবে! তাঁদের জীবন থেকে যদি কলকারখানা, হাতুড়ি পেটানোর আওয়াজ চলে যায়, তাহলে মে দিবস পালনের ওই মুষ্টিবদ্ধ হাত আর কখনও উপরে উঠবে না।

যেভাবে এসেছে শ্রমিক দিবস
দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের ১ মে বুকের রক্ত ঝরিয়ে ছিলেন শ্রমিকরা। সেদিন শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। শ্রমিক সমাবেশকে ঘিরে শিকাগো শহরের হে মার্কেট রূপ নেয় লাখো শ্রমিকের বিক্ষোভ সমুদ্রে। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে অন্তত ১০ শ্রমিক প্রাণ হারান। পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই ঘটনার স্মারক হিসেবে ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ‘মে দিবস’হিসাবে পালন করতে শুরু করে।

পাঠকের মতামত: