কক্সবাজার, শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১

চট্টগ্রামে করোনার চেয়ে আত্মহত্যায় বেশি মৃত্যু

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশজুড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। তবে করোনায় মৃত্যু ছাড়াও চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। এমনকি চলতি বছরে করোনার চেয়ে আত্মহত্যায় চট্টগ্রামে মারা গেছে বেশি মানুষ। এক পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত এক বছরে চট্টগ্রামে করোনায় মারা গেছে ৬৪০ জন। অন্যদিকে আত্মহত্যা করেছে ১ হাজার ৩৮১ জন। ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম কারো মৃত্যু হয়। সরকারি হিসাবে ১২ জুন ২০২১ পর্যন্ত ৬৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ তুলনায় আত্মহত্যা প্রায় দ্বিগুন। এমন কোনো দিন নেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে না।

শুধু বয়স্ক নারী-পুরুষ নয়, অল্পবয়সী এমনকি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হতাশা, সঠিক দিকনির্দেশনা পারিবারিক অশান্তি ও সমঝোতার অভাব।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে আসছে সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন। তাদের গবেষণায় ওঠে এসেছে করোনায় এক বছরে চট্টগ্রামে আত্মহত্যা করেছেন ১ হাজার ৩৮১ জন। সারাদেশে এ সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নগরের ১৬টি থানায় চলতি মাসে ১২ দিনে (১ জুন থেকে ১২ জুন) ১৩টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। আর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৫ মাসে নগরীতে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১১২টি। এর মধ্যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ১১৪ জন, বিষ খেয়ে ৯ জন, আর নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ১ জন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সব চেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বন্দর থানায় ১৭টি, এরপর ডবলমুরিংয়ে ১২টি, ইপিজেডে ১২টি, হালিশহরে ১০টি, বায়েজিদে ১০টি, চান্দগাঁওয়ে ১০টি, পতেঙ্গায় ৯টি, বাকলিয়ায় ৯টি, কোতোয়ালীতে ৮টি, আকবর শাহ থানায় ৬টি, পাহাড়তলীতে ৫টি, পাঁচলাইশে ৫টি, কর্ণফুলিতে ৪টি, খুলশীতে ৩টি, সদরঘাট থানায় ৩টি। এছাড়া গত ৫ মাসে সব চেয়ে কম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে চকবাজার থানা এলাকায়। এই থানা এলাকায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে মাত্র ১টি।

গত ১০ জুন চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানার মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় নিজ বাড়িতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে সামিয়া আক্তার নামে ১১ বছরের এক কিশোরী। হঠাৎ করে মেয়ে কেন আত্মহত্যা করেছে জানেন না বলে জানান, বাবা মো. নাছির।

গত ৮ জুন নগরীর সিআরবি এলাকা থেকে বিবিএ’র শিক্ষার্থী অনিক চৌধুরী মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় তার ব্যাগ থেকে একটি সুসাইড নোটও উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবার থেকে প্রায় ১১দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন অনিক চৌধুরী। অনিক হঠাৎ কেন আত্মহত্যা করলো তা জানা নেই পরিবারের।

গত ৩ জুন নগরীর বন্দর থানা এলাকার কলসী দিঘীর পাড়ে বিষপানে মণি আক্তার নামে ১৩ বছরের এক কিশোরী আত্মহত্যা করে। মণি আকতার ওই এলাকার আরজু মিয়ার মেয়ে। একই দিন (৩ জুন) নগরীর বাকলিয়া থানার কল্পলোক আবাসিক এলাকায় স্বামীর সাথে অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন শিরিন বেগম নামে ২৯ বছর বয়সী এক নারী। তবে কি কারণে অভিমান করেছিলেন শিরিন বেগম তা জানেন না পরিবারের কেউ।

গত ১ জুন নগরীর বাকলিয়ায় তুলাতুলি এলাকায় ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন শারমিন আক্তার (২৬) নামে এক গৃহবধূ। স্বামী তরিকুল ইসলামের জানান, ‘আমাদের দাম্পত্য জীবনে কোন ধরনের সমস্যা ছিল না। তারপরও কেন সে আত্মহত্যা করেছে তা আমার জানা নেই’। একইদিন (১ জুন) নগরীর চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকায় কদল মাঝির বাড়িতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন শানু বেগম নামে ৫৪ বছর বয়সী এক নারী। মাঝ বয়সী এই নারীর পরিণত বয়সের ৩ টি কন্যা সন্তানও রয়েছে। তবে কেন শানু বেগম আত্মহত্যা করলেন তাও আজানা পরিবারের।

গত ২৮ মে নগরীর বন্দর থানা এলাকার আজাদ কলোনিতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সুমি আক্তার (১৪) নামে এক কিশোরী। পুলিশের দাবি, প্রেমিকের সাথে অভিমান করে আত্মহত্যা করেন সুমি। নিহত সুমি আক্তার ওই এলাকার মো. আলীর মেয়ে।

গত ২৪ মে নগরীর ইপিজেড থানার ২ নম্বর মাইলের মাথা এলাকায় ছেলের চিকিৎসা খরচ মিটাতে না পেরে মনকষ্টে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন ৪২ বছর বয়সী মো. শাহীন। অসুস্থ সন্তানকে চিকিৎসা করাতে না পেরে অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। গত ২১ মে বন্দর এলাকায় নেশার টাকার জন্য গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন চা দোকানি মো. জসিম।

করোনায় কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন আকবরশাহ থানার শহীদ মিনার এলাকার যুবক মো. শাওন। হাত খরচের টাকা নিয়ে মায়ের সঙ্গে নিয়মিত ঝগড়া হতো তার। বেকার ছেলের ‘জ্বালাতন’ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বিষ কিনে আনেন মা। তবে মায়ের কিনে আনা সেই বিষ খেয়ে গত ২০ মে আত্মহত্যা করেন ছেলে মো. শাওন।

গত ১৮ মে চান্দগাঁওয়ে পরকীয়ার জেরে আত্মহত্যা করেন গৃহবধু লিমা আক্তার। এছাড়া গত ১৬ মে আকবরশাহ এলাকায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে এসএসসি পরীক্ষার্থী ফারিয়া আক্তার। অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় সব চেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বন্দর থানা এলাকায়। গত ৫ মাসে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ১৭টি।

সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%), পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া (১১.৮%), বৈবাহিক সমস্যা (১১.৮%), ভালোবাসায় ব্যর্থ (১১.৮%), বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্ক (১১.৮%), স্বামীর নির্যাতন (৫.৯%) এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%) থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। দেশে বিষন্নতা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ৭৪ লাখেরও বেশি। গত দশ বছরে বিশ্বব্যাপি এ রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে আগের তুলনায় আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়েছে। এর পেছনে মূল কারণ মানসিক রোগ। গত এক বছরে বাংলাদেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যেটি আগে ছিল ১৮ শতাংশ।

এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অসামাজিক করে ফেলছে। আমাদের সম্পর্কগুলো এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্কগুলো আরও শক্ত করতে হবে। একাকিত্ব অস্থিরতা বাড়ায়। অস্থিরতা থেকে মুক্তির জন্য পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

সিএমপি কমিশনার বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে হলে মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য আর এ জন্য কাউন্সিলিং জরুরি। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলর হতে পারেন বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব এবং শিক্ষকরাও।

আঁচল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তানসেন রুজ বলেন, আমরা আত্মহত্যায় মারা যাওয়া ৫০০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছি। এতে যায়, অধিকাংশ হতাশা থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া পারিবারিক কলহ ও অর্থিক সমস্যার কারণে অত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। করোনাকালে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। ফলে সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। যেটি পরবর্তীতে রূপ নিচ্ছে পারিবারিক কলহে। অবশেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

আঁচল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আরো বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ তরুণ-তরুণীই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৈনিক ৬ ঘণ্টার বেশি সময় কাটাচ্ছেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তাদের খুব একটা যোগাযোগ হচ্ছে না। এতে করে তারা নিজেদের সমস্যাগুলো নিজেদের মধ্যে চেপে রাখছেন। যার প্রভাব পড়েছে মানসিক স্বাস্থ্যে। এ কারণে অনেকে মানসিক অস্থিরতায় মধ্যে পড়েন। ফলে অনেকে আত্মহত্যায় নিজের প্রাণ বিসর্জন নিয়েছেন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষন্নতায় ভুগছেন। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক কলহের কারণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ বিষন্নতা, একাকিত্ব কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হতাশা থেকে আত্মহত্যার পাশাপাশি প্ররোচনার কারণেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় মামলা এবং সঠিক তদন্ত হলে অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসবে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমে যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আনিসুল ইসলাম বলেন, সামান্য ঘটনায় জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার মত ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেন। পারিবারিক এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করা। সমস্যা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করা। আত্মহত্যা যে কোন সমাধান না তা উপলবিদ্ধ করতে হবে।

পাঠকের মতামত: