কক্সবাজার, শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪

দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়া দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে

দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তরুণরা কোনো আড্ডায় যোগ দিলে সব বিষয় ছাপিয়ে আলোচনা যেন বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে। ভালো চাকরি নিয়ে দেশে সাফল্য পাওয়া খুবই সময়সাপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক। তাই শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে যাওয়া ভালো বিকল্প বলেও মনে করেন।

২০২১ সালে প্রতি হাজারে ৩ জন দেশ ছেড়ে বিদেশে অভিবাসী হয়েছিলেন। গত বছর এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে হাজারে ৬ দশমিক ৬। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস নামে জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বিবিএসের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের অভিবাসন বেড়েছে। গত বছর দেশের অভ্যন্তরে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আগের বছরের তুলনায় হাজারে ছয়জনের বেশি অভিবাসী হয়েছেন। আর আগের বছরের তুলনায় প্রতি হাজারের বিপরীতে দ্বিগুণের বেশি মানুষ দেশের বাইরে অভিবাসী হয়েছেন গত বছর।

মধ্যবিত্ত তো বটেই, সাধারণ গরিব ঘরের, এমনকি কৃষক পরিবারের সন্তানেরাও উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়েরাও তাঁদের মেয়েকে পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠাচ্ছেন। আগে সাধারণত বিয়ের পর মেয়েদের বিদেশ পাঠানোর অনুমতি দিতেন বাবা-মায়েরা। এখন বিয়ের আগেই মেয়েরা যেতে পারছে। চিন্তার এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে হয়।

উদ্যোক্তারা জানেন, ১০ এমনকি ১৫ লাখ টাকা খরচ করেও এই দেশে ব্যবসা দাঁড় করানো কত কঠিন। ভালো চাকরি নিয়ে দেশে সাফল্য পাওয়া খুবই প্রতিযোগিতামূলক। তাই বিদেশে চলে যাওয়া ভালো বিকল্প বলেও মনে করেন অনেকে। বিদেশে জীবনযাপনের মান দেশের তুলনায় অনেক ভালো। কাজের ক্ষেত্র অনেক। তাই কাউকে ভবিষ্যত নিয়ে খুব একটা শঙ্কায় থাকতে হয় না। লেখাপড়া শেষ করে ভালো কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, শুধু বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতি ব্যাচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যায়। তাদের খুব কমসংখ্যকই দেশে ফিরে আসে। আর ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’-এর প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন শিক্ষার্থী বিদেশে পড়ালেখার জন্য পাড়ি জমান।

এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৮ হাজার ১১২ জন শিক্ষর্থী গমন করেন। এছাড়া মালয়েশিয়াতে ৬ হাজার ৯০৪ জন, অস্ট্রেলিয়াতে ৬ হাজার ১৯১ জন, কানাডায় ৩ হাজার ৭৩৫ জন, জার্মানীতে ২ হাজার ৯২০ জন এবং যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৬৪৫ জন শিক্ষার্থী যান।

 

এদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও লেখাপড়ার জন্য ২ হাজার ২৫৮ জন শিক্ষার্থী পাড়ি জমিয়েছেন। করোনা মহামারির জন্য ২০১৯ সালের পর বিদেশ গমন শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান আর হালনাগাদ করতে পারেনি সংস্থাটি। তবে করোনা মহামারির সময়ে এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে লেখাপড়া শেষ করে অনেকেই মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। কাঙ্ক্ষিত চাকরির দেখাও পান না অনেক শিক্ষার্থী। এজন্য বছরের পর বছর দেশের বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে। বিদেশ থেকে ডিগ্রি এনেও দেশের কর্মক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন না। তাই জীবিকার তাগিদে আবার তারা বিদেশে চলে যান।

অর্থনীতিবীদরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমেছে। এর সঙ্গে বাড়তি চাপ হিসেবে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। এসব কারণে দরিদ্র মানুষ যে কষ্টে দিন অতিবহিত করছে। গ্রাম কিংবা শহর যে যেখানেই আছেন, তারা বেঁচে থাকার চেষ্টার অংশ হিসেবে অন্যত্র স্থানান্তর হতে চাচ্ছেন।

এদিকে শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা মানুষের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণ বেড়েছে। যেখানে ২০২১ সালে শহরে বসবাসকারীদের প্রতি হাজারে গ্রামে ফেরার সংখ্যা ছিল ৬ জন। ২০২২ সালে প্রতি হাজারে দাড়িয়েছে ১১ জনে। এক জরিপের তথ্যে দেখা গেছে, মানুষের মধ্যে শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা ২০২০ সালে হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। এর আগে এ সংখ্যা ছিল খুবই কম। অন্যদিকে গত বছর গ্রাম ছেড়ে শহরে কিংবা এক শহর ছেড়ে অন্য শহরে স্থানান্তরের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জরিপে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন: শহর ছেড়ে গ্রামে ফেরা মানুষের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণ

গবেষকরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষ যে কষ্টে রয়েছেন, সেটির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় গ্রাম ও শহর উভয় স্থানে মানুষের স্থানান্তর বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে। তাঁরা বলছেন, করোনার সময় নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা এখনো কমেনি; বরং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। তাই বেঁচে থাকার চেষ্টায় মানুষের শহর থেকে গ্রামে ও এক শহর থেকে অন্য শহরে স্থানান্তরও বেড়েছে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ক্ষেত্রে শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের সংখ্যাও। তবে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়া মানুষের অভিবাসন কমেছে। বিবিএসের জরিপের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে প্রতি হাজারে ৪৮ জন গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫।

পাঠকের মতামত: