কক্সবাজার, শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১

পালাচ্ছে ভাসানচরের রোহিঙ্গারা

নোয়াখালীর ভাসানচরে সুরম্য দালানে বসবাসের সুযোগ পেয়েও পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা। অনেকে সপরিবারে আবার কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের রেখেই ভাসানচর থেকে পালিয়েছে। ইতোমধ্যে ৪০-৫০ জন রোহিঙ্গা সুরম্য দালানের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ছেড়েই পালিয়েছে বলে জানা গেছে। কেউ কেউ হয়েছে আটকও। বাসস্থান, খাবার, জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিত্তবিনোদনের সব বাস্তব সুবিধা উপেক্ষা করেই কেন পালাচ্ছে— এমন প্রশ্নে ভাসানচরে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বলছে, কঠোর নিরাপত্তার কারণে বন্দি জীবন বলে অভিহিত করে এখানকার অনেকেই এখন আগের ক্যাম্পে ফিরতে চাচ্ছে।

এর আগেও দেখা গেছে, ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাসের কথা বলে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্প থেকেও পালানোর চেষ্টা চালিয়েছিল তারা। এদিকে ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের পালানোকে ‘সুখে থাকতে ভুতে কিলায়’ প্রবাদের সাথে তুলনা করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গারা আসলেই অস্থির জনগোষ্ঠী। গত ১৮ মে ভাসানচর থেকে টেকনাফে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়ন থেকে ছয় নারী, তিন শিশু ও দুই যুবকসহ ১১ রোহিঙ্গাকে আটক করে সন্দ্বীপ থানা পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাসানচর থেকে দালালের মাধ্যমেই জেলেদের ছোট নৌকায় করে সন্দ্বীপে আসছে রোহিঙ্গারা। সেখান থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ভাসানচরের রোহিঙ্গারা।

পুলিশ জানায়, ওইদিন সকালে রহমতপুর এলাকায় স্থানীয় লোকজন তাদের দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের আটক করে। আটক রোহিঙ্গাদের আদালতেও সোপর্দ করা হয় জানিয়ে ভাসানচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহে আলম জানান, কিছুদিন আগেও ভাসানচর থেকে পালানোর চেষ্টারত আট রোহিঙ্গাকে আটক করে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সময়ে ভাসানচর থেকে পালিয়ে নুরুল আমিন নামের এক রোহিঙ্গা যুবকও টেকনাফের উনছিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিরে যায়। এরই মধ্যে ফের গতকাল রোববার আবার ১৪ রোহিঙ্গাকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানাধীন মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের চৌধুরী বাজার এক নম্বর ওয়ার্ডের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন নদীর কূল থেকে আটক করে স্থানীয় জনতা। তারা ভাসানচর থেকে পালিয়েছিল বলে জানায় পুলিশ। জানা গেছে, আটক রোহিঙ্গারা দালালের মাধ্যমে শনিবার সন্ধ্যায় ভাসানচর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে নৌকায় করে সন্দ্বীপ উপকূলে আসে। চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পৌঁছে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো তাদের। আটক রোহিঙ্গাদের মাইটভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান গ্রামপুলিশের হেফাজতে রেখে পরে সন্দ্বীপ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন। আটকরা হলো— আয়াতুল করিম (৩০), আশ্রাফ উল্লা (৮), নজিম উল্লাহ (৭), ইয়াসমিন আরা (২৯), সালেখা বেগম (১৪), তাছলিমা (১৬), উম্মে (১৭), মুশফিকা (১৬), মো. সাফায়েত (১৬), অলি উল্লা (১২), মো. আনস (১০), রোজিনা (১৫), শুকতারা (১৫) ও মো. ইমতিয়াজ (১৮)। এ নিয়ে গত দেড় মাসে চার দফায় ভাসানচর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে সন্দ্বীপে পালিয়ে আসা মোট ২৯ জন রোহিঙ্গাকে সাধারণ জনগণের সহযোগিতায় আটক করে পুলিশ। সন্দ্বীপ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বশির আহাম্মদ খান বলেন, মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের নদীর কূল থেকে আটক রোহিঙ্গাদের থানায় আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়াও গত ২০ মে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উপজেলার একই এলাকা থেকে আটক করা হয় ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা তিন রোহিঙ্গাকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানায়, সাগরে তিনঘণ্টা সাঁতার কেটে সন্দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি জেলেরা তাদের নৌযানে তুলে সেখানে নিয়ে গেছে।

সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বশির আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, জেলেরা সাগরে সাঁতরাতে দেখে কয়েকজনকে উদ্ধার করেন। পরে জানতে পারেন তারা রোহিঙ্গা, ভাসানচর থেকে পালিয়ে এসেছে। এরপর তাদের ট্রলারে তুলে নিয়ে এসে মাইটভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদে সোপর্দ করেন জেলেরা। আটক তিনজনের নাম— নাজিম উদ্দিন, মোহাম্মদ নাসিম ও আবদুল হামিদ। তারা ভাসানচরের ৪৯ ও ৬২ নম্বর ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসার কথা বলেছে। উখিয়ার ঘিঞ্জি ক্যাম্প থেকে তারা স্বেচ্ছায়ই ভাসানচরে গিয়েছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইনে মামলা দিয়ে পরদিন রোববার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত ডিসেম্বরে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু হওয়ার পর এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা পৌঁছায় ভাসানচরে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, সব রোহিঙ্গাই সেখানে স্বেচ্ছায় গেছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেখান থেকে ৪০-৫০ জন রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের গুচ্ছগ্রামের থাকা একাধিক রোহিঙ্গারা। তবে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে ভাসানচরে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধি ও ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) রঞ্জন চন্দ্র দে গণমাধ্যমকে বলেন, ১২-১৩ জন পলাতক রোহিঙ্গার একটি তালিকা আমরা পেয়েছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি গুচ্ছগ্রামের রোহিঙ্গা নেতা সাংবাদিকদের বলেন, এখান থেকে ৪০-৫০ জন রোহিঙ্গা পালিয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ মে বিকেলে বেড়িবাঁধ থেকে পালানোর চেষ্টারত চার রোহিঙ্গাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। গুচ্ছগ্রামের আরেক নেতার মতে, এখানে আসার পর থেকে প্রায় অর্ধশত রোহিঙ্গা ভাসানচর থেকে পালিয়ে গেছে। আরও অনেকে পালানোর চেষ্টাকালে ধরাও পড়েছে। তাদের অনেককে কারাগারেও যেতে হয়েছে। তবু পালানোর চেষ্টা থামছে না। তবে পলাতক এক রোহিঙ্গার ফিরে আসার ঘটনাও ঘটেছে। সুরম্য দালানে সব ধরনের সুযোগ পেয়ে বাস করলেও কঠোর নিরাপত্তার কারণে একে বন্দি জীবন বলে অভিহিত করে অনেকে আগের ক্যাম্পে ফিরতে চাচ্ছে বলে অভিমত ভাসানচরে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের। এ বিষয়ে ভাসানচর থানার ওসি মাহে আলম বলেন, ‘ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গারা প্রায়ই পালানোর চেষ্টা করে। তবে এমন অনেক চেষ্টাই ব্যর্থ করে দিয়েছি আমরা। কারাগারে পাঠানো রোহিঙ্গাদের জামিনে মুক্ত করে পুনরায় ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হতে পারে।’

উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বেচ্ছায় পরিবার নিয়ে ভাসানচরে যাওয়া অনেকে পরিবার রেখে পালিয়ে এখানে ফিরে এসেছে। প্রথমে সাঁতরে, পরে জেলেদের নৌকায় সাগর পাড়ি দিচ্ছে বলে উল্লেখ করছে ফিরে আসা ব্যক্তিরা। ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পটি উদ্বাস্তুদের জন্য স্বর্গতুল্য। পৃথিবীর কোথাও শরণার্থীদের এত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার নজির নেই।

২০১৭ সালে ২৫ আগস্টে কোরবানি ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু করে। এর ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পুরনোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। পরবর্তীতে কক্সবাজার থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। আশ্রয়ণ-৩ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। এর অংশ হিসেবে গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় স্বেচ্ছাগামী প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছে দালানের এক একটি ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়া হয়। রোজার পর সেখানে অবস্থানকারীদের জন্য উৎসবমুখর ঈদের জামাত ও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

পাঠকের মতামত: