কক্সবাজার, শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২ মাদক পাচারকারী গডফাদার!

আরফাতুল মজিদ, কক্সবাজার::

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪ রোহিঙ্গা শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইয়াবা পাচার, ডাকাতি, চুরি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে গেল চার বছরে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪টি। যেখানে আসামি ২ হাজার ৬৮৭ জন রোহিঙ্গা। এরপরও আশ্রিত রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের কারও কারও হাতে উঠে এসেছে আগ্নেয়াস্ত্র। গড়ে তুলছে ছোট ছোট সন্ত্রাসী বাহিনী। সব মিলেয়ে এখন তারা অনেকটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকা।

ইতোমধ্যে তারা খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক পাচার ছাড়াও নানা অপরাধে জড়িয়েছে। যার ফলে ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের মাত্রা গত চার বছরে চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই নারীসহ নিহত হয়েছে ১১২ জন রোহিঙ্গা। যা ভাবিয়ে তুলেছে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১০১৪টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ২ হাজার ৬৮৭ জন রোহিঙ্গাকে।

যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত মামলা। বাকি ৫৭ শতাংশ অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ক্ষমতা আইন, সরকারি কাজে বাধাদান, ডাকাতি, ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানবপাচার ও নিজেদের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে মারামারি সংক্রান্ত মামলা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭০টি খুনের মামলা হয়েছে গত চার বছরে। এ সময় ৭৬২টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৮৭টি অস্ত্র, ৬৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৩৪টি মামলা হয়েছে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অপরাধে। অপহরণ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ মাদক ব্যবসায় জড়িত। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের হাত ধরে আসছে ইয়াবা ও স্বর্ণের বারসহ নানা রকম মাদকদ্রব্য। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২ জন মাদক পাচারকারী গডফাদারের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। মাদকের বড় বড় চালান পাচারে জড়িত তারা। এসব অবৈধ মালামালের কর্তৃত্ব ও ভাগাভাগি নিয়ে ক্যাম্পে মাঝে মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নিয়মিত অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের অপরাধ দমনে সেখানে দায়িত্বরত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি থানা পুলিশের একাধিক টহল দল অভিযান পরিচালনা করে আসছে। রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে পুলিশ আরও কঠোর হবে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দায়ের করা ১০১৪ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ হাজার ৬২২ রোহিঙ্গা। আর তদন্ত শেষে ৮৯৪টি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ওই সময় থেকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত চারজন নারীসহ শুধু কক্সবাজার জেলায় বন্দুকযুদ্ধে ২৮৪ জন নিহত হয়েছেন।

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সেখানে রোহিঙ্গাদের এমন অপরাধ কর্মকা- আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকেও ভাবিয়ে তুলেছে।

১৬ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম বলেন, এক বছরও পূর্ণ হয়নি এপিবিএন কাজ করছে। তবুও আমরা ক্যাম্পের অপহরণ বাণিজ্য, মাদক চোরাচালনসহ নানা অপরাধ ঠেকাতে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইন কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমনে র‌্যাব প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি মাদক পাচারে জড়িত রোহিঙ্গাদের আটক করা হয়েছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মামলার সংখ্যা। হত্যা, অপহরণ, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২ জন মাদক পাচারকারী গডফাদারের সন্ধান মিলেছে। বড় পাচারকারীদের ছত্রছায়ায় থেকে ক্যাম্পের আরও অনেকেই এ ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। অভিযানে যারা ধরা পড়ছে, তারা তো বহনকারী। আমরা চেষ্টা করছি রোহিঙ্গা গডফাদারদের ধরার।

পাঠকের মতামত: