কক্সবাজার, বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

আহা! বিরিয়ানি

 

তাঁকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বললে, ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করে দেওয়ার মানুষ কম নেই চারপাশে। বিতর্কও কম নয়। কেউ বলেন, তিনি এসেছেন তুর্কিদের হাত ধরে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে। কেউ বলেন, আফগানিস্তানের রুক্ষভূমি থেকে যে মোগলরা পাড়ি জমিয়েছিলেন ভারতের দিকে, তিনি তাঁদের হাত ধরেই এসেছেন। কারও মত, এটি মধ্য এশিয়ার খাবার। সেখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কেউ বলেন, দূর মিয়া, এইটা ভারতীয় জিনিস। খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শ অব্দে রচিত ‘বৃহদারণ্যক উপনিষদে’ বিরিয়ানির আদি কায়ার সাকিন পাওয়া যায়। সেই কায়ার সঙ্গে দিনকে দিন অনেকের প্রেম হয়েছে। সে প্রেমিকদের মধ্যে যেমন আছেন তুর্কি হেঁশেলের বাবুর্চিরা, তেমনি আছেন মোগল পাকশালার রথী-মহারথীরা। আর মহামতি ইবনে সিনা যে প্লভ বা পিলাফের কথা বলেছিলেন, তুর্কিরা আসার বহু আগেই সেটি ছড়িয়ে পড়েছিল আমাদের উপমহাদেশে। এখানকার হেঁশেলে তার চর্চা যে হয়নি, সেটা কে বলতে পারে? সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ‘ডেগেরো ভেতরে’।

বিরিয়ানি নিয়ে তথ্যের এই কচকচানি আর ঐতিহাসিক ক্যাচাল শত শত বছর উড়ে বেড়াচ্ছে শরতের মেঘের মতোই। তাতে কী-ইবা গেছে-এসেছে? ঢাকা শহরের অলিগলিতে গজিয়ে ওঠা বিচিত্র সব বিরিয়ানির দোকানের কথা ভাবতে ভাবতে আমি কোলবালিশের ওম মেখে পাশ ফিরি। আজ মহান শুক্রবার। দুদণ্ড বেশি ঘুমালে পৃথিবীর তেমন কোনো হেরফের হবে না।

রাজকুমার প্রেমে পড়েছেন। প্রেমিকা ডাকসাইটে সুন্দরী–খবর পাক্কা। কিন্তু ঝামেলা হলো, গরিব বলে রাজপরিবারে বিয়ের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না সেই ডাকসাইটে সুন্দরী তরুণী। রাজপুত্রের হৃদয়ে বেদনার শর বিদ্ধ হলো। রাজপুত্র বলে তিনি আত্মহত্যা করতে পারলেন না। কিন্তু নাওয়া-খাওয়া দিলেন বন্ধ করে। খবর গেল রাজার কানে। রাজা ডেকে পাঠালেন বিখ্যাত চিকিৎসক মহামতি ইবনে সিনাকে। রাজার কাতর মিনতি, বংশধরকে সারিয়ে তুলতেই হবে। ইবনে সিনা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করলেন রাজপুত্রের অবস্থা। অবশেষে হাঁপ ছাড়লেন তিনি–খুঁজে পেয়েছেন রোগের কারণ। রাজাকে রাজপুত্র আর গরিব সুন্দরীর প্রেমের কথা বলেছিলেন কি না, গল্পে সেটা বলা নেই। শুধু বলা আছে, ওষুধ হিসেবে ইবনে সিনা ব্যবস্থা দিয়েছিলেন প্লভ খাওয়ার। চাল, মাংস, পেঁয়াজ, গাজর, চর্বি, লবণ ও পানি দিয়ে প্রস্তুত করা সে খাবার। উজবেকিস্তানে বিয়ের আয়োজনে জাতীয় পদ হিসেবে প্লভের উপস্থিতি নিশ্চিত, সে নাকি আজও।

এ জন্যই কি সাহিত্যিক আনিসুল হক আমাকে বলেছিলেন, ঢাকার এক নম্বর বিরিয়ানি হলো যেকোনো বিয়েবাড়িতে রান্না করা বিরিয়ানি। আর দুই নম্বর? সে নিয়ে পাবলিকের বহু মত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার সুরাহা হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ আমি দেখি না, যখন মানুষের প্রকৃতিপ্রদত্ত স্বভাব হলো তালগাছটা তাঁর।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি আর পুরান ঢাকার বাইরের ঢাকা শহরের অলিগলিতে গড়ে ওঠা বিরিয়ানির দোকানের বিরিয়ানির মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। পার্থক্য মসলার, ঘি আর তেলের। সে জন্য শুনবেন, শুনবেন কেন দেখবেনও, পুরান ঢাকার মানুষ তিন বেলা-ই বিরিয়ানি খেতে পারে। মোগল আমলের জীবনযাত্রার যে অপভ্রংশ এখনো পুরান ঢাকায় প্রচলিত, সেটা নতুন ঢাকায় নেই। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ দোকানে বিরিয়ানি রান্না হয় তেল দিয়ে। কিন্তু বিরিয়ানির প্রাচীন রেসিপিতে ঘি পাবেন। তেল নয়।
বিরিয়ানি হলো চাল-ঘি-মাংসের ত্রিপদী। বলতে পারেন, বিসমিল্লাহ খাঁ, রবিশঙ্কর আর জাকির হোসেনের যুগলবন্দী। মাংসের বদলে সবজি বিরিয়ানিও হয়। যেমন হতো নিজাম-উল-মুলকের রসুইখানায়। জানা যায়, নিজামের বাবুর্চিরা ৪৭ ধরনের বিরিয়ানি রান্না করতেন। তার মধ্যে তাহিরি বিরিয়ানি নামে একখানা বিরিয়ানি ছিল, যা খেতেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণেরা। সেই বিরিয়ানি মুরগি বা খাসির মাংসের বদলে গাজর, ফুলকপি ও মটরশুঁটি দিয়ে রান্না হতো বলে জানা যায়।

বিরিয়ানি নিয়ে সাত লাখ শব্দ লিখে ফেলা যায়। শুক্রবার এত হুজ্জোত পোষায় না। বরং একটি পুরোনো রেসিপি দিই, রান্নার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। এর নাম ‘বিরিয়ান-ই-নূরমহলি’। এটি আধুনিক বিরিয়ানির একেবারে কাছাকাছির একটি প্রাচীন রেসিপি।

উপকরণ
মাংস ১ কেজি, ঘি ১২৫ গ্রাম, চাল ১ কেজি, দারুচিনি ২ গ্রাম, লবঙ্গ ২ গ্রাম, এলাচি ২ গ্রাম, জাফরান ১ গ্রাম, আদা ২০ গ্রাম, রসুন পরিমাণমতো (মূল রেসিপিতে আছে ২৫০ গ্রাম), লবণ ৬০ গ্রাম, ধনে ২০ গ্রাম, কালিজিরা ২.৫ গ্রাম।

রান্নার পদ্ধতি
মাংস টুকরো করে কেটে আদার রসের সঙ্গে লবণ দিয়ে মেশান। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন। রসুন মেশান। অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। একটি কড়াইয়ে ১০০ গ্রাম ঘিয়ে পেঁয়াজ ভাজুন। পেঁয়াজের সঙ্গে রসুনকুচি মেশান। সব পানি শুকিয়ে যাওয়ার আগে কালিজিরা ভেজানো পানি দিন। মাংসের টুকরো দিন। এরপর দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচি ও জিরা মেশান।

অন্য একটি হাঁড়িতে চাল আধা সেদ্ধ করে রাখুন। অল্প কিছু চাল ঘি ও জাফরানের সঙ্গে মেশান। কিছু সময় অপেক্ষা করুন। সব চাল মাংসের নিচে দিন। ওপর থেকে বাকি ঘি ঢেলে দিন। মাখা আটা দিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা আটকে দিন। পাঁচ মিনিট জোর আগুনের জ্বালে রাখুন। এরপর ঢিমে আঁচে ৪৫ মিনিট দমে রাখুন।

সূত্র: বিরিয়ানির ইতিহাস, নীলাঞ্জন হাজরা, অনুবাদ
গৌরাঙ্গ হালদার

পাঠকের মতামত: