কক্সবাজার, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০

সংকট আরও ঘনীভূত: প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ, কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা, বাড়ছে ব্যয়

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে স্বীকৃত রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। গত তিন বছরে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। মিয়ানমারে এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে। বরং চলতি বছরের শুরু থেকেই কভিড-১৯ মহামারির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মনোযোগ হারিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মিয়ানমারের অপপ্রচারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীন ভূমিকায় সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

আজ ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট শুরুর তিন বছর পূর্ণ হলো। এ সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সমকালকে বলেছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তরিকভাবেই রোহিঙ্গাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করছে। তবে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য মিয়ানমারের যা করণীয় তারা তা করেনি। রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির বদলে উল্টো সহিসংতা ও অস্থিরতার খবর আসছে। ফলে বাংলাদেশের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, এ সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় বিশ্বের যেসব দেশের সামর্থ্য আছে এবং যারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার, তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে বাংলাদেশের ওপর চাপ কমবে। তিনি বলেন, এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে একে ঘিরে আরও নানামুখী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যত দ্রুত সম্ভব সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর ভয়াবহতম গণহত্যা শুরু হয়। এরপর ২৫ আগস্ট থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে। ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অবশ্য এর আগে তিন দশক ধরে মিয়ানমারের সরকারের বর্বর নির্যাতনের মুখে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে অবস্থান করছিল। এর সঙ্গে একবারে সাত লাখ যোগ হয়ে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। পরে নানাভাবে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা আসে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা। এখনও রাখাইনে মিয়ানমারের বাহিনীর নিষ্ঠুর অভিযান চলছে এবং মাঝেমধ্যে রোহিঙ্গারা নানাভাবে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। অনেক রোহিঙ্গাকে দিনের পর দিন সাগরে ভাসতেও দেখা গেছে। জাতিসংঘ এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা সংকটকেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সংকট সমাধানে গত তিন বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দৃশ্যমান হয়নি।

বরং গত তিন বছরে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ক্রমাগত কমেছে। জাতিসংঘ সংশ্নিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংকট মোকাবিলায় ৯২ কোটি ডলারের চাহিদা ছিল। ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয় ৬২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০১৯ সালে মোট চাহিদার ৬৭ শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে ৯৫ কোটি চাহিদার বিপরীতে সাড়ে ৬৫ কোটি ডলার পাওয়া গিয়েছিল। চাহিদার তুলনায় জোগান সবচেয়ে বেশি এসেছিল ২০১৭ সালে, মোট চাহিদার ৭৩ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সহায়তা এভাবে কমতে থাকায় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যয় বেড়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সূত্র জানায়, চলতি বছর রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কিন্তু কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এই প্রাক্কলনের ৬০ শতাংশ অর্জিত হবে কিনা, তা নিয়েই বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে।

দায় চাপানো হচ্ছে বাংলাদেশের ওপর :মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যখন সে দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন ও গণহত্যা চালিয়ে তাদের নিশ্চিহ্ন করে চেষ্টা করেছে, তখন সেখান থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা মানুষকে আশ্রয় দিয়ে একটি মানবিক, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এই ভূমিকার জন্য বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে মানবিক রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই মানবিকতার পরিচয় দেওয়াটা যেন এখন বাংলাদেশের জন্য দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার বাহিনীর নিপীড়নের মুখে রোহিঙ্গারা আবারও পালিয়ে সাগরে ভাসতে থাকলে পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব অনেকাংশে শেষ করেছে। এসব বিবৃতির সারমর্ম হচ্ছে, বাংলাদেশ যেন এই রোহিঙ্গাদেরও আশ্রয় দেয়। এমনকি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়াও দুর্বলতর অর্থনীতির বাংলাদেশকে আহ্বান জানিয়েছে আরও রোহিঙ্গার দায়িত্ব নিতে।

প্রত্যাবাসনের কূটনীতি স্থবির : সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কভিড-১৯ মহামারির কারণে এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় রেখে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা চলছে। একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ চীনের কথায় বিশ্বাস রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তি করেই কূটনীতির চোরাবালিতে আটকে গেছে। এখন অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এই যে, বিশ্বজুড়ে যত জায়গায় বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা বলছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে। নেপিদো বলছে, চুক্তি অনুযায়ী তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে, আলোচনা চলছে। চীনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা দিচ্ছে যে, মিয়ানমার চুক্তির পথ ধরেই এগোচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এই চুক্তি একটা গোলকধাঁধা তৈরি করে রেখেছে। ভাবটা এমন যে, দুটো দেশ যখন একটা চুক্তি করেই ফেলেছে, অতএব সংকট সমাধানে তারা চূড়ান্ত ধাপেই আছে। অতএব ‘দেখা যাক, কী হয়’- এমন একটা অবস্থানে আছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু দেখিয়ে চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও এ নিয়ে আলোচনা তুলতে দিচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, সার্বিকভাবে পরিস্থিতিটা এমন জায়গায় যে, খুব শিগগিরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। তবে আশা হারালে চলবে না। প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তা ঠিকই আছে। তবে মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারও বসে নেই। তারাও নানাভাবে রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বাংলাদেশের কাঁধে রেখে এ সংকট পাশ কাটাতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নির্জলা অপপ্রচার থেকেই সেটা স্পষ্ট হয়। আবার এ সংকটের কার্যকর সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এক ধরনের উদাসীন মনোভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে এ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।

অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মিয়ানমারের তাদের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তারা যেন নাগরিক অধিকার নিয়ে জীবনধারণ এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তা পায়, সেটা মিয়ানমার সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা সংকটের তিন বছর উপলক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ সংকটের পরিপূর্ণ সমাধান আছে মিয়ানমারে। কফি আনান কমিশনের সকল সুপারিশ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এটি সম্ভব।

বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে প্রয়োজন সর্বস্তরের অংশগ্রহণ, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে নতুন করে কার্যকর আলোচনা শুরু এবং দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ। এসবের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ গ্রামে ফেরার সুব্যবস্থা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়ে একটি পরিস্কার রোডম্যাপ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় বাংলাদেশি জনগণকে সাহায্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পরিবর্তিত পরিস্থিতির নতুন চাহিদাগুলো মেটানো এবং এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে আরও বেশি কাজ চালিয়ে যাওয়া। সুত্র-সমকাল

পাঠকের মতামত: