কক্সবাজার, শনিবার, ২২ জুন ২০২৪

মেজর (অবঃ) সিনহা হত্যার ৩ বছর পূর্তি আজ

চাঞ্চল্যকর মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকান্ডের ৩ বছর পূর্তি সোমবার (৩১ জুলাই)। হত্যার ৩ বছর পূর্তিতে মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার বিচারের রায় কার্যকর করার দাবিতে সোমবার (৩১ জুলাই) বিকেল ৩ টায় আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। নিহত মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান’র পরিবার ও কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য পরিবারবর্গের উদ্যোগে কক্সবাজার শহরের শহীদ সুভাষ হল (পাবলিক লাইব্রেরী হল) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই ঈদুল আজহার আগের রাত সাড়ে ৯টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশ কর্মকর্তা লিয়াকত আলী’র গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। পুলিশের গুলিতে মেজর (অব:) সিনহা হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তখন ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

তখন নিহত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের গাড়ি থেকে কিছু ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধারের বানোয়াট কথা বলে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ হতে এসব বানোয়াট গল্প নিয়ে দায়ের করা হয় একাধিক মামলা। কিন্তু ঘটনার পরদিনই পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’ এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সোচ্চার হয়, গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জনগণও প্রতিবাদী হয়ে উঠে। তাতে আলোচিত সিনহা হত্যা মামলা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত তদন্ত ও অভিযোগপত্র দায়েরের মাধ্যমে তা বিচারিক পর্যায়ে চলে যায়।

হত্যাকান্ডের ৫ দিনের মাথায় ২০২০ সালের ৫ আগস্ট নিহত সিনহা’র বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে টেকনাফ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পরে বিচারিক আদেশে মৃত্যুদন্ডাদেশ হওয়া প্রদীপ কুমার দাশসহ ৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর : এসটি-৪৯৩/২০২১ ইংরেজী। যার জিআর মামলা নম্বর : ৭০৩/২০২০ ইংরেজি। যার টেকনাফ মডেল থানা মামলা নম্বর : ৯/২০২০ ইংরেজি।
এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় কক্সবাজার জেলা পুলিশ প্রশাসনের পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, এসআই, এএসআই, কনস্টেবল সহ কক্সবাজার জেলা পুলিশের প্রায় ১৪ শত সদস্যকে কক্সবাজার থেকে একযোগে বদলী করা হয়। গঠিত হয় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যুগ্মসচিব) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ৪ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। এই কমিটি তদন্ত শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ সহ তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী-কে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয় টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত’কে। আদালত থেকে র্যামব-১৫ কে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়।
এরপর মামলার আসামি ৭ পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় ৩ জন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এর ৩ সদস্য এবং প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরো মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যা ব। ২০২১ সালের ২৪ জুন মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামী কনস্টেবল সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসে। আসামীদের মধ্যে ১২ জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতের কাছে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন। শুধু ওসি প্রদীপ, কনস্টেবল রুবেল শর্মা এবং সাগর দেব আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেননি।
এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষী সহ আলোচিত মামলাটির চার্জসীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন র্যাদব-১৫ এর তৎকালীন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ১৫ জনকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগপত্রে মেজর (অব:)সিনহা হত্যাকান্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
র্যা বের তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) বিভিন্ন ধরনের আলামত ও ডিজিটাল কন্টেন্ট আমলে এনে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের মামলায় চার্জসীট দেন। চার্জসীট থেকে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৭ জুলাই সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফতি নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করেন। ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সাধারণ মানুষ পুলিশের মাধ্যমে তাদের জিম্মি দশা, অত্যাচারের ঘটনা মেজর সিনহা’কে জানায়। এসব জানতে পেরে সিনহা মানসিকভাবে খুবই পীড়িত হন।
আরো জানা গেছে, টেকনাফের ওসি প্রদীপের কথিত স্বর্গরাজ্য ছিল পুরো টেকনাফ। মূলত তার স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা এবং তার অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সিনহা ও তার সঙ্গীরা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওসি প্রদীপ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করতেন এবং ইয়াবাকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানতে ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত থানায় যান। র্যাহবের অভিযোগপত্রে বলা হয়, থানায় তাদের অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে বলা হয়। তা না হলে ‘তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেব’ বলে হুমকি দেন প্রদীপ। ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয় বলে জানায় তদন্তকারী কর্মকর্তা।
কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে কিছুদিন আদালতের স্বাভাবিক বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল তাঁর আদালতে মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু করেন।
কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি ৩০০ পৃষ্ঠার এ মামলার ঐতিহাসিক রায় দেন। মামলায় ২ আসামীকে মৃত্যুদন্ড ও ৬ আসামীকে যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা হয়। মৃত্যুদন্ড দেওয়া আসামীরা হলো-বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।
এছাড়া একই রায়ে ৬ আসামী যথাক্রমে কনস্টেবল সাগর দেব, রুবেল শর্মা, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন, আয়াজ উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয়। রায়ে সাজাপ্রাপ্ত ৮ জন আসামীর প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডও প্রদান করা হয়।
মামলার বাকী ৭ জন আসামীকে মামলার দায় থেকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়। তারা হলো-কনস্টেবল সাফানুর করিম, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব, কামাল হোসেন আজাদ ও মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।
এ রায়ের পর বিজ্ঞ বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল তাঁর দৃঢ়চেতা ও সাহসী রায়ের জন্য প্রশংসায় ভাসতে থাকেন। বিচারকের আন্তরিকতা, দক্ষতা, নিয়মানুবর্তিতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট সবার মুখে মুখে ইতিবাচক আলোচনা হতে থাকে। এতে সারাদেশে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়। বিচারপ্রার্থীদের মাঝে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা আরো বাড়তে থাকে। প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসে “বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড”। ফৌজদারী অপরাধ বিশেষজ্ঞরা এ রায়কে একটি ঐতিহাসিক, যুগান্তকারী ও দৃষ্টান্তমূলক রায় বলে অভিহিত করতে থাকেন। তাদের মতে, করোনা পরিস্থিতিতেও অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি বিজ্ঞ বিচারক নিষ্পত্তি কর।

পাঠকের মতামত: