কক্সবাজার, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

১৫ টাকার বোতলের পানি ২০ টাকা, ভোক্তার ক্ষতি

বোতলজাত পানি বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু কোম্পানি বিক্রেতার কমিশন বাড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এই বাড়তি কমিশন ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করতে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দাম।

 

কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি দামের কিছুই পাচ্ছে না কোম্পানি, পুরোটাই যাচ্ছে বিক্রেতার পকেটে। তবু কোম্পানি দাম বাড়াচ্ছে এ কারণে যে, বাড়তি কমিশন পাওয়ার জন্য যেসব কোম্পানির পণ্যের দাম বেড়েছে, বিক্রেতারা সেসব কোম্পানির পণ্যই দোকানে রাখছেন। তাতে ক্রেতারা বাধ্য হচ্ছে সেগুলো কিনতে।

 

 

এভাবে ভোক্তাদের বাড়তি দাম পরিশোধে বাধ্য করা হচ্ছে পরোক্ষভাবে। আর পরোক্ষভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা প্রতিযোগিতা কমিশন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নে একটি কোম্পানি একে ‘বিপণন কৌশল’ আখ্যা দিয়েছে। আরও কয়েকটি কোম্পানিকে এই কৌশল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের একজন অধ্যাপক একে ‘অপকৌশল’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এভাবে বাজারের প্রতিযোগিতা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের বিষয়টি দেখা উচিত।

 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও বলেছে একই কথা। তারা বলছে, বোতলের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অনুযায়ী পণ্য বিক্রি না হলেই তারা ব্যবস্থা নিতে পারে। এই কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তদারকির দায়িত্ব প্রতিযোগিতা কমিশনের।

 

তবে প্রতিযোগিতা কমিশন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

 

রাজধানীর মহাখালী আমতলীতে কথা হয় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইফুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রহস্যজনক বিষয় হচ্ছে, যেগুলোর দাম বাড়ানো হয়েছে দোকানিরা বেছে বেছে সেই পানিগুলোই দোকানে রাখছেন। এখন আর চাইলেও কোথাও ১৫ টাকায় ৫০০ মিলিলিটারের পানি পাওয়া যাচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় পানিও পিছিয়ে নেই।”

 

বাড়তি দামের বোতলই দোকানে বেশি

 

কিনলে, মাম ও অ্যাকুয়াফিনার ৫০০ মিলি বা আধা লিটারের বোতলের দাম সম্প্রতি ৫ টাকা বেড়ে ২০ টাকা হয়েছে।

 

সমজাতীয় অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় ৫ টাকা বেশি হলেও প্রান্তিক দোকানগুলোতে এই তিনটি ‘দামি’ ব্র্যান্ডই শোভা পাচ্ছে বেশি।

 

 

কিছু কিছু বড় দোকানে স্পা, প্রাণ, জীবন, ডেইলি, মুক্তা ও ফ্রেশসহ বিভিন্ন কোম্পানির ১৫ টাকা দামের বোতল দেখা গেলেও সব জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না।

 

 

পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে ভোক্তারা সুলভে কিছু পেলে সেই পণ্যই কিনবে, তবু বিক্রেতারা বাড়তি দামের পানি কেন রাখছেন- এই প্রশ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে জানা যায় বিক্রেতার বাড়তি কমিশনের বিষয়টি।

 

বোতলের পানি: বাজার নিয়ন্ত্রণের ‘কমিশন কৌশলে’ ভোক্তার ক্ষতি

বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানিগুলো বাড়তি দামের প্রায় পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছে তাদের পকেটে। বাড়তি লাভ পেয়ে দামি পানি বিক্রিতেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন তারা।

 

ঢাকার আগারগাঁওয়ের বিএনপি বাজার ঘুরে দেখা গেল, কিনলে, অ্যাকুয়াফিনা ও মাম ব্র্যান্ডের আধা লিটারের (৫০০ মিলি) বোতলগুলো দোকানিরা এখন কিনতে পারছেন প্রতিটি ১০ টাকায়। নতুন এমআরপি (সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য) অনুযায়ী এসব পানি ২০ টাকা করে বিক্রি করতে পেরে তারা বেজায় খুশি।

 

গত জুনের আগে এসব বোতলের এমআরপি ছিল ১৫ টাকা করে; তখন কিনতে হত ৯ টাকা ৩৭ পয়সায়। আগে যেখানে বোতলপ্রতি ৫ টাকার কিছু বেশি লাভ হত, এখন সেখানে লাভ হচ্ছে ১০ টাকা।

 

মহাখালীর চা দোকানি রতন শিকদার জানান, তার দোকানে মাম পানির ৫০০ মিলির বোতলগুলোর কেনা দাম ৯ টাকা ৭৯ পয়সা। বিক্রি করছে ২০ টাকায়।

 

কিছুদিন আগে ১৫ টাকা এমআরপি লেখা থাকার সময় এসব পানি কিনতে হত ৮ টাকা করে। সে হিসাবে তখন লাভ হত ৭ টাকা, এখন লাভ হয় ১০ টাকার বেশি।

 

কয়েকজন পাইকারি বিক্রেতা জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অফার ও প্যাকেজ আকারে পানি সরবরাহ করে। প্যাকেজে কখনও কখনও ১০ টাকারও অনেক কমে পানি পাওয়া যায়। পরিচিত ক্রেতাদের কাছে ২০ টাকার কমে পানি বিক্রি করেন তারা। এতে দোকানির প্রতি ক্রেতার আস্থা বাড়ে।

 

 

বোতলের পানি: বাজার নিয়ন্ত্রণের ‘কমিশন কৌশলে’ ভোক্তার ক্ষতি

মামের মূল কোম্পানি পারটেক্স বেভারেজের ‘ডেইলি’ নামে আরেকটি ব্র্যান্ড রয়েছে বাজারে। মামের দাম বাড়লেও ডেইলি আগের মতই আধা লিটার ১৫ টাকা এবং এক লিটার ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারে মামের তুলনায় ডেইলির উপস্থিতি কম।

 

ভোক্তা অধিকার নিয়ে সোচ্চার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মুখপাত্র কাজী আব্দুল হান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একদিকে দাম বাড়াবে আরেক দিকে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার মার্জিন বাড়িয়ে দিয়ে বাজার ধরার চেষ্টা করবে, এটা একচেটিয়া ব্যবসা বা মনোপলির কূটকৌশল।

 

“এক সময় বাজারে অভ্যস্ততা সৃষ্টি হলে তার হয়ত খুচরার লাভের মার্জিন কমিয়ে আনবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের এক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার মেন্ডেট আছে।”

 

‘কৌশল’ নিয়ে চুপ বেশিরভাগ কোম্পানি

 

বিক্রেতার কমিশন বাড়িয়ে ক্রেতাকে বাড়তি দরের পণ্য কিনতে পরোক্ষভাবে বাধ্য করার বিষয়টি নিয়ে মাম পানির উৎপাদক পারটেক্স বেভারেজ, অ্যাকুয়াফিনার পেপসিকো এবং কিনলের উৎপাদক কোকাকোলার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

 

তবে পেপসিকো ছাড়া অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

 

ফোনে জবাব না পেয়ে কোম্পানিগুলোর দাপ্তরিক ই-মেইলে বার্তা পাঠানো হয়। তবে চার দিনেও কোনো সাড়া মেলেনি।

 

 

কোকাকোলা বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন বলে সেখান থেকে জানানো হয়। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে কয়েকদিন সময় চাওয়া হয়।

পাঠকের মতামত: