কক্সবাজার, শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০

টেকনাফের আতঙ্ক ছিল ওসি প্রদীপের দুই সিভিল টিম

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারক করতে র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এখন কক্সবাজার রয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার তিনি কক্সবাজার যান। তদন্ত কার্যক্রম সরেজমিনে দেখভাল ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে র‌্যাব মহাপরিচালক বেশ কয়েকদিন কক্সবাজারে অবস্থান করবেন। একটি দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এ তথ্য জানায়।

এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ সিভিল টিম চালাতেন। অধিকাংশ সময় সিভিল ড্রেসে এই টিমের সদস্যরা মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে লোকজনকে ধরে নিয়ে আসত। প্রদীপের এক নম্বর সিভিল টিমের সদস্যরা হলেন- এসআই সন্দ্বীপ, ফকরুল, মিঠুন, সুদীপ ও ছাব্বির, এএসআই রাম ও নিজাম। দ্বিতীয় সিভিল টিমের সদস্যরা হলেন- এসআই রুবেল, নাজির, কামরুজ্জামান ও শাহিদ। এই টিমের একজন সদস্য ছিলেন সাগর। যিনি সিভিল টিমের সিভিল সদস্য ছিলেন। একটি সূত্র জানায়, সাগর ওসি প্রদীপের আত্মীয়। আর প্রদীপের ভাগিনা বলে পরিচয় দিতেন এএসআই মিঠুন।

সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, দেশব্যাপী আলোচিত এ মামলায় যাতে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি না থাকে, সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছেন সংশ্নিষ্টরা। কে কী কারণে সিনহাকে গুলির ঘটনা ঘটাল, তা নিশ্চিত হতে আসামি ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক নাকি পরিকল্পিত তাও বের করার চেষ্টা চলছে। তবে এখনও এই মামলার আসামিরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। গুলির কারণ নিয়েও একাধিক ভাষ্য দিয়েছেন।

জানা যায়, সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন র‌্যাব মহাপরিচালক। তদন্ত কার্যক্রমের সার্বিক অগ্রগতি ও মামলাটি কীভাবে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, বাহিনীর প্রধান হিসেবে সেই পরামর্শ দেবেন তিনি।
এদিকে, সিনহার ঘটনায় পুলিশের মামলার তিন সাক্ষীকে ফের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সকালে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহর আদালত এ আদেশ দেন। এর আগে প্রথম দফায় গত ২০ আগস্ট এই আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড শেষ হয়। আসামিরা হচ্ছেন টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের সিনিয়র এএসপি খাইরুল ইসলাম বলেন, এই তিন আসামিকে এর আগে জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার ব্যাপারে কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। তাদের দেওয়া এসব তথ্য-উপাত্ত মামলার অন্য আসামিদের তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার ব্যাপারে আসামিদের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন। যাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, নিরপরাধ লোকজন যাতে সাজা না পায়, দোষীরা যাতে ছাড়া না পায়। তাই আসামিদের পুনরায় রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে।

এ ছাড়া সিনহাকে গুলি করার ঘটনাটি তাৎক্ষণিক, নাকি পরিকল্পিত ছিল- এর উত্তর পেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যায়, সে ব্যাপারে কমিটি সুনির্দিষ্ট মতামত তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরবে। ৩১ আগস্টের মধ্যে সিনহার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে। তবে তার আগে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন কমিটির সদস্যরা। এখন পর্যন্ত ৬৮ জনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নিয়েছে তদন্ত কমিটি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আদালতে তিন আসামির জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলেও চার দিন মঞ্জুর হয়। সুবিধাজনক সময়ে তাদের র‌্যাব হেফাজতে নেওয়া হবে। সিনহা হত্যার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে র‌্যাবের একটি দল টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকা থেকে গত ৯ আগস্ট পুলিশের দায়ের করা মামলার এই তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল।

এদিকে ওসি প্রদীপ, লিয়াকত ও নন্দ দুলালকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। তাদের চার দিনের রিমান্ড শেষ হবে শুক্রবার। আটক পুলিশের অন্য চার সদস্যের দ্বিতীয় দফায় রিমান্ড মঞ্জুর হলেও তাদের এখনও হেফাজতে নেয়নি র‌্যাব।

গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এই ঘটনায় গত ৫ আগস্ট তার বোন শাহরিয়ার শারমিন ফেরদৌস ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, লিয়াকত আলী ও নন্দ দুলাল রতিসহ পুলিশের নয় সদস্যকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় র‌্যাবকে। সুত্র-সমকাল

পাঠকের মতামত: